আখলাক

ধুমপান ও জর্দা সেবন: পূর্ণ ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

ধুমপানকে ‘হারাম’ (‘নিষিদ্ধ’) স্বীকার করতে না চাওয়া লোকদের যুক্তি ও খণ্ডন: 

অনেক বছর আগে যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ততোটা উন্নত হয়নি তখন অনেক ইসলামী বিশেষজ্ঞ বলতেন যে, ধুমপান করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। হাদীস থেকে যেহেতু কাঁচা পেঁয়াজ বা কাঁচা রসুন খাওয়া মাকরুহ জানা যায়, তার উপর ভিত্তি করে ঐ সকল বিশেষজ্ঞরা উক্ত ফতোয়া দিতেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের বহু বিশেষজ্ঞ ধুমপানকে ‘মাকরুহ’ বলে থাকেন।

বাংলাদেশে কিছু ধর্মপ্রান লোকও আছেন যারা ধুমপান করেন! তাদের মাথায় টুপি আছে, গালে দাড়ি আছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন কিন্তু নামাজ শেষে আবার ধুমপানও করেন। তাদেরকে যখন বলা হয়- ধুমপান করা জায়েয নয় তখন তারা অনেক সময় অজ্ঞতাবশত বা জেদের কারণে তা মানতে চান না। ধর্মপ্রাণ লোকদেরই যদি এ অবস্থা হয় তাহলে বেনামাযী যুবকদের কি অবস্থা তা তো সহজেই অনুমান করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে কিছু আলেম অনেক সময় না বুঝেই ধুমপানের ব্যাপারে বিভিন্ন প্রকার কথা বলে থাকেন। কেউ বলেন এটা মকরুহ, আবার কেউ বলেন এটা মাকরুহে তাহরিমী (হারামের কাছাকাছি)। এর পেছনে অবশ্য কিছু কারণ আছে। যখন তাদেরকে প্রশ্ন করা হয় ‘হুজুর, আমি তো তামাক পাতা পুড়িয়ে তার ধোয়া পান করি, কিন্তু যারা তামাক পাতা সরাসরি খায়, তাদের জন্য বিধান কি?’ তখন উক্ত হুজুর সাহেবগণ বিপাকে পড়ে যান। কারণ, তিনি নিজেই হয়তো পানের সাথে তামাকের পরিবর্তিত রূপ (অর্থাৎ জর্দা) খান। তাই সঠিক কথাটি বললে তিনি নিজেও ‘হারামে জড়িয়ে যান’ বলে এটাকে হারাম না বলে অন্য কিছু (যেমন: মাকরুহ বা মাকরুহে তাহরিমী) বলার চেষ্টা করে থাকেন।

এখন বিজ্ঞান অনেক উন্নত হয়েছে। আমরা এখন জানতে পেরেছি যে, ধুমপান আসলে এক ধরনের ধীর গতির বিষক্রিয়া। তামাক যেভাবেই গ্রহণ করা হোক তাতে এ বিষক্রিয়া রয়ে যায়। আর এ কারণে বর্তমানে পৃথিবীর বেশির ভাগ ইসলামী বিশেষজ্ঞ বলেন ধুমপান করা হারাম। শুধু মুসলিম বিশেষজ্ঞই নয় অমুসলিমরাও ধুমপানের বিষক্রিয়ার ব্যাপারটি অকপটে স্বীকার করেন। সিগারেটের প্যাকেটেও এ ব্যাপারে সতর্কীকরণ উল্লেখ করা থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায় শুধু ধুমপানের কারণে। সব ধরনের তামাক সেবনকে হিসাবে আনলে সংখ্যাটা আরো বড় হবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে যে কোনো ধরনের খারাপ ও ক্ষতিকর বস্তু সেবন করা হারাম। আল্লাহপাক আল কুরআনে বলেছেন, “সে সমস্ত লোক, যারা আনুগত্য অবলম্বন করে এ রাসূলের, যিনি উম্মী নবী, যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকর্ম থেকে; তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষণা করেন ও নিষিদ্ধ করেন খারাপ বস্তুসমূহ।” (৭/সূরা আল আরাফ:১৫৭)

অনেকের মতে, হারাম বস্তুগুলোর নাম ধরে ধরে আল্লাহ তো বিস্তারিত ভাবে ঘোষণাই করেছেন। তাদের মতে, কুরআনে আর হাদীসে কোথাও ধুমপানকে সুস্পষ্ট ভাবে হারাম করা হয়নি। এ যুক্তিতে তাদের মত হলো, আল্লাহ যা হারাম করেননি, তা পৃথিবীর কোনো মানুষের বা গবেষকের অধিকার নেই তা হারাম করার। কিন্তু ধুমপানকে ‘হারাম’ ঘোষণাকারীরা নিজ সিদ্ধান্তে হারাম ঘোষণাকারী নন। তারা কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ীই তাদের এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাছাড়া ধুমপানকে হারাম ঘোষণাকারীরা কোনো ছোটোখাটো আলিম নন। তারা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আলিম ও গবেষক। উনারা কুরআন-হাদীসের আলোকেই ধুমপানকে হারাম হিসেবে গণ্য করেছেন।

কিছু লোকের মতে, পৃথিবীর কোনো দেশ বা গবেষক বা কোনো দেশের মাদক দব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অদ্যাবধি সিগারেটকে মাদকের তালিকায় নিয়ে আসেনি। তাহলে এটা তো মাদক বা নেশার বস্তু নয়। কাজেই উক্ত লোকদের মতে তা হারাম নয়। কিন্তু, কোনো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন সংস্থা সিগারেটকে মাদক বা নেশার বস্তু হিসেবে নিষিদ্ধ করলো কিনা সে অনুযায়ী শরীয়তের বিধান কি নির্ণিত হয়? তারা যা বলবে সেটাই ইসলামে জায়েয বা নাজায়েয হয়ে যাবে? কোনো দেশে লাইসেন্স করে মদ খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেই কি মদ হালাল হয়ে যাবে? মনে রাখা প্রয়োজন, ইসলাম সর্বসময়ের জন্য। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইসলাম মূলনীতি দিয়েছে যা অবশ্য মান্য। হেরোইন, ইয়াবা, কোকেন ইত্যাদি হারাম করে কোনো আয়াত ও হাদীস নেই বলেই এগুলো হালাল হয়ে যাবে না। রাসূল (সা.) তো তরবারি দিয়ে যুদ্ধ করতেন। তাহলে কি আমরা এখন সেই তরবারি দিয়েই যুদ্ধ করবো? নাকি এক্ষেত্রে ইসলামের যে মূলনীতি সেটা মানাটাই মুখ্য? নির্দিষ্ট উপকরণের (যেমন: তরবারীর) চেয়ে মূলনীতি কি বড় নয়? অনুরূপভাবে বস্তু ভক্ষণ করার ক্ষেত্রেও ইসলাম মূলনীতি দিয়েছে যা মুসলিমকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এ হিসেবে কিয়ামাত পর্যন্ত সিগারেট বা এ ধরনের ক্ষতিকর যে কোনো বস্তু- তা যে কোনো নামেই আসুক না কেনো- সেটা হারাম হবেই। নাম উল্লেখ থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, মূলনীতির আলোকেই তা হারাম হতে পারে।

কিছু লোক বলেন, ধুমপান করার প্রচলন রাসূল (সা.) এর যুগে ছিলো না। তাই, তাদের মতে, ধুমপান হারাম ঘোষণার সুযোগ সে যুগে হয়নি। এ মতে কিছুটা ত্রুটি রয়েছে। এটা ঠিক যে, ইসলামে নাম উল্লেখ করে ধুমপানকে হারাম করা হয়নি। তবে ইসলাম একটি সাধারণ বিধান প্রণয়ন করেছে যে, যেসব বস্তু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা পাশের লোকের জন্য কষ্টদায়ক কিংবা যার দ্বারা ধন-সম্পদের ক্ষতি সাধিত হয় তা হারাম।

কিছু লোক বলার চেষ্টা করেন, সিগারেটকে হারাম বলাটা দেশের তামাক শিল্প বন্ধ করার এক ধরনের ধান্ধাবাজি। কিন্তু এ অভিযোগ সর্বাংশে সত্য নয়। যারা চিকিৎসা পেশার সাথে যুক্ত তারা ভালো করেই জানেন, অসংখ্য রোগের ক্ষেত্রেই তার কারণগুলোর মধ্যে ধুমপান ও তামাক সেবন অন্যতম। কাজেই, যে জিনিস ব্যক্তি বা সমাজের জন্য খারাপ, ইসলাম সেই জিনিস সমর্থন করে তা হালাল করে দিতে পারে কি? কারণ, ইসলাম কোনো বাজে বা হেলেফেলার বিধান নয়। যেটা হারাম কেউ না মানলেও সেটা হারাম, যে হারামের পক্ষে সাফাই গাওয়া ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য নয়। আর তামাক সাধারণভাবে একটি ক্ষতিকর দ্রব্য। তাই এটাকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এর কোনো উপকার বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হলে শুধু সে ক্ষেত্রে এর ব্যবহারকে সীমাবদ্ধ রাখাই যথেষ্ট। তাছাড়া- ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো খারাপ বস্তুর ভেতরে সুচিকিৎসার উপাদান থাকার কথা নয়।

ধুমপায়ীদের ধুমপান ত্যাগ না করতে পারার অজুহাত:

ধুমপায়ীরা যখন ধুমপান পরিত্যাগ করবে তখন সাধারণভাবে শারিরীক ও মানসিক কিছুটা চাঞ্চল্য দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। আর এটা অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা হলো শেষ সিগারেটটি পান করার এক ঘন্টা বা দু’ঘন্টা পরেই। তবে, এ সকল জটিলতা পাঁচ দিনেরও কম সময়ের মধ্যেই নি:শেষ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

নীচে সিগারেট পরিত্যাগের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে যে জটিলতাগুলো দেখা দেয় সেগুলো প্রতিকারসহ উল্লেখ করা হলো:

মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হবে। প্রতিকার: গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেওয়া

ক্লান্তি, অবসাদ, রুক্ষভাব ও কঠোরতা অনুভব হবে। প্রতিকার: বেশী করে ঘুমাবার চেষ্টা করা

মুখ ও গলা শুকিয়ে যাবে। প্রতিকার: বেশী করে পানি ও জুস পান করা

কাশি হবে ও অনিদ্রা দেখা দেবে। প্রতিকার: উষ্ণ পানি দিয়ে প্রতি দিন গোসল করা

মাথা ঘোরা অনুভব হবে। প্রতিকার: নির্মল বাতাসে যাওয়ার চেষ্টা করা

বিকেলের দিকে অস্থিরতা অনুভব হবে। প্রতিকার: বাজারে বা কারো সাথে নির্মল আড্ডা দেওয়ার জন্য চলে যাওয়া

চঞ্চলতা অনুভব হবে। প্রতিকার: খেলাধূলা বা ব্যায়ামের অনুশীলন করা

গাড়ি চালানোর সময় অস্থিরতা অনুভব হবে। প্রতিকার: গাড়িতে ক্যাসেট বাজিয়ে কুরআন তিলাওয়াত বা ভালো কোন ইসলামী আলোচনা শোনা

কাজে মন বসবে না। প্রতিকার: গতানুগতিক কাজ পরিবর্তন করে অন্য কাজ করার চেষ্টা করা

মল ত্যাগ করতে কষ্ট হবে। প্রতিকার: বেশী করে ফল খাওয়ার চেষ্টা করা

ধুমপান ও জর্দা সেবনে অপব্যয় হয়:

আল্লাহ বলেন, “তোমরা অপব্যয় করো না। অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।” (১৭/সূরা বনী ইসরাইল:২৭)

বাংলায় ‘অপচয়’ ও ‘অপব্যয়’ শব্দ দুটি অনেক ক্ষেত্রে সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এ দুইয়ের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় ব্যয় করার নামই অপচয়, যেটাকে আরবি বলা হয় ইসরাফ। অন্যদিকে, অপব্যয় হচ্ছে অন্যায় ও অযৌক্তিক উপায়ে সম্পদের অপব্যবহার, যাকে আরবিতে তাবযীর বলা হয়।

যদি কেউ টাকা জ্বালিয়ে দেয় তবে অনেকেই বলবে যে, লোকটি পাগল হয়ে গেছে। তাহলে শত শত টাকাকে ধুমপানের জন্য জ্বালিয়ে দেওয়াকে কি বলা যায়? অথচ এর দ্বারা আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতির সাথে সাথে পাশের ব্যক্তিরও কষ্ট হয়ে থাকে। তাছাড়া পরিবেশ নোংরা ও দূষিত করাও কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। তাই, ধুমপানের ব্যাপারটি অনেকটা এরকম যে, টাকার একটা নোট নিয়ে সেটাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। অন্য কথায়, সিগারেটে আগুন ধরানো আসলে টাকা পুড়িয়ে ফেলা যা অপব্যয় ছাড়া আর কিছুই নয়। অনুরূপভাবে জর্দা সেবন করা মানেও অর্থের অপব্যয় করা। এমন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ আছে কি যিনি এগুলোকে অপব্যয় বলবেন না? ইসলামের দৃষ্টিতে বাজে ও বেহুদা খরচ তিন ধরনের। যেমন: (ক)নাজায়েয কাজে (খ)হালাল কাজে কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত এবং (গ)নেক কাজে কিন্তু লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে। ধুমপান ও জর্দার খাতের খরচ কোনোভাবেই উপরিউক্ত ‘খ’ ও ‘গ’ এর অন্তর্ভুক্ত নয় বরং ‘ক’ এর অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ এ খাতের খরচ বাজে খরচও অপব্যয়।

অনেক অপব্যয় আছে যাতে মানুষের লাভ-ক্ষতি কিছু নেই। এগুলো সকলের কাছে অন্যায় ও সর্বসম্মতভাবে তা অপব্যয় বলে গণ্য। কিন্তু ধুমপান এমন একটি অপব্যয় যাতে শুধুই মানুষের ক্ষতি; কোনো লাভই নেই। আর উপরিউক্ত আয়াত অনুযায়ী সকল অপব্যয় হারাম (ও শয়তানের কাজ)।

ধূমপানে বিভিন্ন দেশে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় তাও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো কোনো দেশে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা ৭ থেকে ১২ ভাগ ক্ষতি হয় ধুমপানজনিত কারণে। ধূমপানের জন্য যে পরিমান অর্থ সারা পৃথিবীতে ব্যয় হয়, তা দিয়ে কোটি কোটি ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র মানুষদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা যেতো। এক কথায়, ধুমপান ও জর্দা সেবন করায় অপব্যয় হয় বলে এগুলো হারাম।

অপচয় ও অপব্যয় মানুষকে ও দেশকে পরনির্ভরশীল করে রাখতে ভূমিকা পালন করে। আজ যে অপচয়কারী, অপব্যয়কারী ও বিলাসী, হতে পারে কাল সে ভিখারী ও পরমুখাপেক্ষী। এটা ব্যক্তি জীবনের মতো রাষ্ট্রীয় জীবনেও সত্য।

খারাপ বস্তুসমূহকে হারাম করা হয়েছে:

আল্লাহ বলেন, “তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য হালাল করে দেন ভালো ও উত্তম (তাইয়িবাত) বস্তু আর হারাম করে দেন খারাপ ও ক্ষতিকর (খাবায়িস) বস্তু।” (৭/সূরা আল আরাফ:১৫৭)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “আপনি বলে দিন, পবিত্র বস্তু তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে।” (৫/সূরা আল মায়িদাহ:৪)

মুসলমানদের জন্য খাদ্যদ্রব্য দুই প্রকার। হালাল আর হারাম। এর বাহিরে কিছু নেই। হালালের বিভিন্ন শ্রেণীই হচ্ছে মুস্তাহাব, মুবাহ, মাকরুহ প্রভৃতি।

সিগারেট, বিড়ি, তামাক এগুলো কি পবিত্র ও ভাল বস্তু? অবশ্যই এটা খারাপ, অপবিত্র, ক্ষতিকর, দুর্গন্ধময় ও নোংরা বস্তু। উপরিউক্ত আয়াত দিয়ে আল্লাহ খারাপ বস্তুকে হারাম করেছেন।

অনেকেই বলেন, আল কুরআনে তো বলা হয়নি “তোমরা ধুমপান করো না (বা জর্দা সেবন করো না)।” হাদিসে রাসূলে কোথাও নেই যে, “ধুমপান করা যাবে না (বা জর্দা সেবন করা যাবে না)”, তা হলে ধুমপান (বা জর্দা সেবন) ইসলামী শরীআতে নিষিদ্ধ হলো কিভাবে? জবাবে বলা যায়, এমন বহু জিনিস আছে যা হারাম করা হয়েছে অথচ তা কুরআন-হাদিসে নাম ধরে উল্লেখ করা হয়নি। যেমন, কুরআন ও হাদীসে কোথাও বলা হয়নি ‘তোমরা সাপ খেয়ো না।’ তারপরও আমরা খাইনা। কারণ উপরিউক্ত আয়াতের ভিত্তিতে তা হারাম হয়ে গেছে। কেননা তা ক্ষতিকর ও খারাপ।

একজন বিবেকবান ব্যাক্তির সামনে যদি একটি রুটির টুকরো বা ভাতকে জুতা দিয়ে চাপ দেওয়া হয় সাথে সাথে সে কাজটিকে অন্যায় বলে অভিহিত করবে। কিন্তু যদি সিগারেটকে জুতা দিয়ে চাপ দেওয়া হয় তাহলে সেটাকে অন্যায় বলে চিহ্নিত করবে না। এর দ্বারা এটাই প্রকাশিত হয় যে, বিড়ি, সিগারেট,হুক্কা এবং জর্দা প্রভৃতি অপবিত্র।

ধুমপান ও জর্দা সেবন নিষিদ্ধ হওয়ার কথা কুরআন-হাদীসে সরাসরি বলা না থাকলেও ইসলামের মূলনীতির আলোকে তা হারাম (বা নিষিদ্ধ)। এরপরও যদি কেউ বলেন, ধুমপান ও জর্দা সেবন শরীআতের নিষিদ্ধ বস্তুর মধ্যে পড়ে না, তা হলে তাকে ঐ রোগীর সাথে তুলনা করা যায় যিনি ডাক্তারের নির্দেশ মত চিনি ও তামাক ত্যাগ করলেন ঠিকই কিন্তু রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ, সিগারেট এবং পান খাওয়ার নামে তামাকমিশ্রিত জর্দা- ইত্যাদি সবই খেলেন আর বললেন, ‘ডাক্তার তো এগুলো নিষেধ করেননি’!

ধুমপান ও জর্দার মাঝে রয়েছে জাহান্নামী খাদ্যের বৈশিষ্ট্য

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জাহান্নামীদের খাদ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “এটা তাদের পুষ্টিও যোগাবে না ক্ষুধাও নিবারণ করবে না।” (৮৮/সূরা আল গাশিয়াহ:৭) ধুমপান ও জর্দা সেবনের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যই রয়েছে যে- তা গ্রহণকারীর পুষ্টির যোগান দেয় না, ক্ষুধাও নিবারন করে না। কাজেই ধুমপান ও জর্দা গ্রহণের তুলনা জাহান্নামের খাবারের সাথেই করা যায়। কোনো মুসলিম কি চায় জাহান্নামী ধরনের কোনো খাবার জেনে বুঝে গ্রহণ করতে?

ধুমপান ও জর্দা সেবনে রয়েছে ক্ষতি:

আল্লাহ বলেন, “তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, উভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর তার মধ্যে মানুষের জন্য উপকারিতাও আছে। তবে এগুলোর পাপ উপকারের চেয়ে বড়।” (২/সূরা আল বাকারাহ:২১৯) আল্লাহতাআলার এ বাণী দ্বারা বুঝা যায় মদ-জুয়ার মধ্যে উপকারিতা থাকা (যেমন: শরীরের উত্তাপ বৃদ্ধি) সত্ত্বেও আল্লাহ তা হারাম করেছেন। তাহলে এক বিচারে ধুমপান ও জর্দা সেবন তো মদ-জুয়ার চেয়েও জঘন্য। কারণ তাতে কোনো ধরনের উপকার নেই; বরং একশ ভাগই ক্ষতি। অবশ্য, কেউ কেউ ধুমপানের বা জর্দা সেবনের উপকারিতা প্রমাণ করতে চান। তাদেরকে বুঝতে হবে, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে পেতে ধুমপানের ও জর্দা সেবনের উপর নির্ভরশীলতাকে উপকারিতা বলা যায় না। তাই, সার্বিক বিচারে ধুমপান ও জর্দা সেবন নিষিদ্ধ না হওয়ার কোনো দলীল নেই।

অনেকে বলেন মদ-জুয়া হারাম করা হয়েছে নেশার কারণে কিন্তু ধুমপান বা জর্দা সেবন করলে তো কোনো নেশা হয়না। তাদেরকে বলা যায়, এই ধুমপান ও জর্দা ছাড়তে পারছেন না আপনি- এটাই বড় নেশা (বা আসক্তি)। তাছাড়া হাদীস অনুযায়ী, যেটার বেশি পরিমাণ গ্রহণ করলে নেশা হয় সেটার অল্প পরিমাণ গ্রহণও হারাম। সিগারেট ও জর্দার তামাক বেশি পরিমাণ করলে নেশা তো হয়ই এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। এ কথা আজ শুধু অনুমান নয় বরং প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য।

নিজে নিজেকে হত্যা, ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না:

আল্লাহ বলেন, “তোমরা নিজেদের হত্যা করোনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতি দয়ালু।” (৪/সূরা আন নিসা:২৯)

CDC (Center for Disease Control) এর হিসাবে- প্রতি বছর বার্ধক্যজনিত কারণ, দূর্ঘটনা ও HIV তে যতো মানুষ মারা যায় তার মোট সংখ্যার চেয়ে শুধুমাত্র ধুমপানজনিত কারণে বেশি মানুষ মারা যায়।

সিগারেটের প্যাকেটেও বিভিন্ন সতর্কীকরণ উল্লেখ করা থাকে। যেমন: ‘ধুমপানে বিষপান’ অথবা ‘ধুমপান মৃত্যু ঘটায়’ অথবা ‘ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ অথবা ‘ধুমপান ক্যান্সারের কারণ’ প্রভৃতি।

সঙ্গে সঙ্গে না হলেও সময়ের ব্যবধানে ধুমপান মৃত্যুর জন্য দায়ী। সিগারেট যেমন নিজেকে জ্বালায় তেমনি ধুমপায়ীকে ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে শেষ করে দেয়।

বর্তমানে ধুমপানজনিত রোগে প্রতি বছর ৪০ লাখ লোক মারা যাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ১ কোটি লোক আক্রান্ত হতে পারে এবং প্রতি দিনই কমপক্ষে ১ লাখ তরুণ তামাকে আসক্ত হতে পারে।

কেউ সাধারণত জোর করে কাউকে ধুমপান বা জর্দা সেবন করায় না বরং ব্যক্তি নিজেই স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ করে। অথচ, আল্লাহ নিজেদেরকে হত্যা করাকে নিষেধ করেছেন। তাই ধুমপান ও জর্দা সেবন করা কেনো হারাম হবে না?

আল্লাহ আরও বলেছেন, “এবং তোমরা নিজ হাতে নিজেকে ধ্বংসে পতিত করো না।” (২/সূরা আল বাকারাহ:১৯৫)

ধুমপান ও জর্দা সেবন ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের কারণ। এগুলো মানুষকে ধ্বংস ও হত্যার জন্য দায়ী। তাই সহজেই বুঝা যায়, ধুমপান ও জর্দা সেবন করা মানেই আল্লাহর আদেশ লংঘন করা ও হারাম কাজ করা।

অপরকে কষ্ট দেওয়া বা তার নিহত হওয়ার কারণ সৃষ্টি করা অন্যায়:

সিগারেটের বাজে গন্ধ অনেকের সহ্য হয় না আবার অনেকের হাঁপানী (বা অ্যাজমা) থাকলে তাদেরও সমস্যা হয়। আর সিগারেটের বাজে গন্ধ ফেরেশতাদেরও দূরে ঠেলে দেয়। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, “যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।” (৩৩/সূরা আল আহযাব:৫৮)

CDC এর হিসেবে প্রতি বছর গড়ে ৪৯৪০০ অধুমপায়ী মারা যায় ধুমপায়ীদের ধোয়ার কারণে আক্রান্ত হয়ে। এই মানুষগুলোকে (শরীয়াতের দৃষ্টিতে বিনা কারণে) হত্যা করে ধুমপায়ীরা। আর বিনা কারণে কাউকে হত্যার ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন- “যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেনো সব মানুষকেই হত্যা করে।” (৫/সূরা আল মায়িদা:৩২) তাই বলা যায়, অপরকে কষ্ট দেওয়া বা তার নিহত হওয়ার কারণ হওয়া যেহেতু নিষিদ্ধ তাই ধুমপান ও জর্দা সেবন করাও নিষিদ্ধ।

নেশাদ্রব্য শয়তানের পথে চালায়:

নেশাদ্রব্য প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, মূর্তি (বা প্রতিমা) এর বেদী এবং ভাগ্য নির্ধারক শর (বা শুভ অশুভ নির্ণয়ের তীর ইত্যাদি) হচ্ছে শয়তানের অপবিত্র কাজ (উল্লেখ্য অপচরকারী শয়তানের ভাই)। অতএব এগুলো থেকে বেঁচে থাক- যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা কি সাবধান হবে না?” (৫/সূরা আল মায়েদাহ:৯০-৯১)

মদপানের ক্ষতির অনেকগুলোই ধুমপান ও জর্দা সেবনের দ্বারাও অর্জিত হয়ে থাকে। যেমন: গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ধুমপান ও নেশাদ্রব্য গ্রহণের ফলে: ক্ষুধা ও হজমশক্তি নষ্ট হয়, চেহারা বিকৃত হয়ে পড়ে, কর্মক্ষমতা কমে যায়, স্থায়ীভাবে জ্ঞানবুদ্ধি হ্রাস পায়, রক্ত দূষণ হয়, স্নায়ু দুর্বল হয়ে আসে, লিভার ও কিডনী বিনষ্ট হয়ে যায়, বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্থায়ীভাবে কফ ও কাশি দেখা যায়, যৌনশক্তি হ্রাস পায় ও স্বাভাবিক যৌন স্পৃহা কমে যায়, শ্রবণশক্তি কমে যায়, দাঁতে, মুখে ও ফুসফুসে কালো আবরণ তৈরি হয়, পুরুষত্বহীনতা, ক্যান্সার, এইডস এবং অনিবার্য মৃত্যুর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই, এটা কি ভাবা যায় যে, যে জিনিস ব্যক্তি বা সমাজের জন্য খারাপ, ইসলাম সেই জিনিস সমর্থন করে বা সেটিকে হালাল ঘোষণা করে দেয়? ইসলামকে এমন বাজে বা হেলাফেলার বিধান মনে করা ঠিক নয়। যেটা হারাম, সেটা হারামই। কেউ মানলেও হারাম; না মানলেও হারাম। তাই, ভুলেও হারামের পক্ষে প্রচার করা বা সাফাই গাওয়া উচিত নয়।

বিষাক্ত জিনিস ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ:

রাসূল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি বিষ পানে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনের মধ্যে অনন্তকাল তাই চাটতে থাকবে। সেখানে সে চিরকাল অবস্থান করবে।” (সহিহ মুসলিম)

ধুমপান যে বিষপান এটা সবাই একবাক্যে স্বীকার করে। শুধু তাই নয়, সিগারেটের প্যাকেটেও তা লেখা থাকে।

ইউরোপে একসময় ধুমপানকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো এবং ধুমপানকারীকে শাস্তি প্রদান করাও হত।

আত্মহত্যা স্বল্প সময়েও করা যায় আবার দীর্ঘমেয়াদীভাবেও করা সম্ভব। স্বেচ্ছায় ধুমপানের দ্বারা দীর্ঘমেয়াদে মৃত্যুবরণ করাও সরাসরি আত্মহত্যার পর্যায়ভুক্ত। আত্মহত্যা করা হারাম। তাই, ধুমপান, জর্দা সেবন বা অন্য যে কোনো কাজ যা মৃত্যু ঘটায় বা মৃত্যুর ঝুঁকি সৃষ্টি করে তা অবশ্যই হারাম।

নিজের ও অন্যের ক্ষতি করা যাবে না:

রাসূল (সা.) বলেন, “নিজের ক্ষতি স্বীকার করবে না, অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।” (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, সহীহ)। ধুমপান মানেই নিজের ক্ষতি (আর্থিক, শারীরিক, ও দ্বীনি ক্ষতি) এবং মানুষকে কষ্ট দেওয়া ও তাদের ক্ষতি করা। যা নিজের ক্ষতি করে এবং মানুষের ক্ষতি করে তা কি হালাল হতে পারে?

রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, “তোমার প্রতি তোমার শরীরের অধিকার আছে।” ধুমপান, জর্দা সেবন বা শরীরের জন্য ক্ষতিকর অন্য দ্রব্য গ্রহণে শরীরের হক নষ্ট করা হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি মানুষ মারা যায় ধুমপানের (ও তামাক গ্রহণের) কারণে। যারা ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা যায়, তাদের মধ্যে ৯০% হলো ধুমপানের (ও তামাক গ্রহণের) কারণে। এছাড়া হৃদরোগ, গ্যাস্ট্রিক আলসারসহ অনেক জীবননাশকারী রোগ সৃষ্টি করে ধুমপান ও তামাক সেবন। এমনকি গর্ভবতী মায়েরা ধুমপান করলে (বা তামাক গ্রহণ করলে) তাদের বাচ্চাদের বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মানোর সম্ভবনা অনেক বেশি থাকে। এভাবে নিজের বা মানুষের ক্ষতি করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম (বা নিষিদ্ধ)।

নিজের শরীরটাও নিজের নয় বরং আল্লাহ প্রদত্ত আমানাত। এ আমানাতের ক্ষতি করা এক ধরনের খিয়ানাত। আর অন্য মানুষের ক্ষতি করলে বান্দার হক নষ্ট করা হয়- যা সংশ্লিষ্ট বান্দা মাফ না করলে আল্লাহও মাফ করবেন না বলে বর্ণনা রয়েছে। ধুমপান করলে পাশের লোকের আরো বেশি ক্ষতিও হয়। কারণ ধুমপায়ী ফিল্টার করা ধোয়া টানলেও প্রতিবেশীকে ফিল্টার না হওয়া ধোয়া টানতে বাধ্য করে। কাজেই ধুমপানের মধ্যে আমানাতের খিয়ানাত ও মানুষের হক নষ্ট এ দু’টো হারামই শামিল।

ধুমপান শুধু স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর নয়। আত্নার জন্য ক্ষতিকর, স্বভাব-চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর, পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী, সমাজ ও পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। এর চেয়ে বড় ক্ষতির দিক হলো ধুমপানের মাধ্যমে ইসলামের নীতি ও আদর্শ লংঘন।

প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া নিষেধ:

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে সে যেনো তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।” (বুখারী) ধুমপানকারী তার ধুমপানের দ্বারা স্ত্রী-পরিজন, সহযাত্রী, বন্ধু-বান্ধব ও আশে-পাশের লোকজনকে কষ্ট দিয়ে থাকে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা গেছে, চেইন স্মোকারদের স্ত্রীদের ফুসফুসে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভবনা বেশি। তাছাড়া, কোনো অধুমপায়ী ব্যক্তি যদি ধুমপায়ী ব্যক্তির কাছে অবস্থান করে, তাহলে এমনিতেই এক সপ্তমাংশ সিগারেটের নিকোটিন অধুমপায়ীর শরীরে প্রবেশ করে। এ কারণে পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন অধুমপায়ীদেরকে ধুমপানের ধোয়া থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট। এজন্যই তাদের অন্যতম একটি শ্লোগান হলো: “আমাদেরকে নিরাপদ নি:শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দাও।”

সিগারেটের গন্ধ যে কতোটা অসহ্য তা শুধু অধুমপায়ীরাই বুঝে। ঘুম থেকে ওঠার পরে একজন ধূমপায়ীর মুখে যে দুর্গন্ধ হয়, তা দুনিয়ার অনেক বাজে গন্ধের সাথেও তুলনা করা যাবেনা। রাস্তাঘাটে অনেকে ধুমপায়ীর মুখের দুর্গন্ধ নীরবে কষ্ট সহ্য করেন এবং মনে মনে ধুমপানকারীকে অভিশাপ দেন। আবার দু-একজন প্রতিবাদ করে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে যান। নিষিদ্ধ কাজ করেও বহু ধুমপায়ী বাহাদুরী প্রদর্শন করে।

রান্নায় রসুন ও পেয়াজ এর ব্যবহার বৈধ ও প্রসিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কাঁচা রসুন ও কাঁচা পেঁয়াজ খেলে মুখে হালকা দুর্গন্ধ হয়ে থাকে- যা পাশে থাকা মানুষের জন্য কষ্টের কারণ হতে পারে। তাই, রাসূল (সা.) (কাঁচা) রসুন বা পেঁয়াজের গন্ধ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। নবী (সা.) বলেছেন,“কখনোও কেউ যদি (কাঁচা) রসুন বা পেঁয়াজ খায় সে আমার কাছ থেকে ও মসজিদ থেকে দূরে থাকবে।” (সহীহ আল বুখারী, প্রথম খণ্ড, অধ্যায়:আযান,হাদীস নং ৮৫৫) অন্য হাদীসে রাসূল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি কাঁচা পেঁয়াজ অথবা রসুন খাবে, সে যেনো আমাদের থেকে আলাদা থাকে, আমাদের মসজিদের নিকটবর্তী না হয় এবং বাড়িতে বসে থাকে।” (মুসলিম) ধুমপানের দুর্গন্ধ কাঁচা পেঁয়াজ বা রসুনের চেয়ে বহুগুণ প্রকট, নিকৃষ্ট ও কষ্টদায়ক। ধুমপানের দুর্গন্ধ কাঁচা পেঁয়াজ বা কাঁচা রসুনের চেয়ে প্রকট হওয়ায় এর হুকুমও ‘মাকরুহ’ থেকে প্রকট হয়ে ‘হারাম’ এ পৌঁছে যায়। তাছাড়া ধুমপানে যদি দুর্গন্ধ সৃষ্টি নাও হতো তবুও তা অন্য কারণে হারাম। কারণ, তামাক নেশা সৃষ্টিকারী পদার্থ হওয়ায় তা ধুমপান ও জর্দা সেবনের নামে যতো অল্পই গ্রহণ করা হোক তা নিষিদ্ধ। মোটকথা, অন্যকে কষ্ট দেওয়া এবং নেশাসৃষ্টিকারী দ্রব্য সেবন যেহেতু নিষিদ্ধ তাই ধুমপান ও জর্দা সেবন করাও নিষিদ্ধ (বা হারাম)।

সম্পদ নষ্ট করা যাবে না:

রাসূলে কারিম (সা.) বলেন, “আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তোমাদের তিনটি বিষয় ঘৃণা করেন। (এক) ভিত্তিহীন ও সনদ-সূত্র বিহীন কথা-বার্তা (দুই) অধিকহারে প্রশ্ন করা (তিন) সম্পদ নষ্ট করা।” (বুখারি ও মুসলিম) ধুমপানকারী ও জর্দা সেবনকারী সম্পদ নষ্ট করে এ ব্যাপারে জ্ঞানী ও চিন্তাশীলদের মধ্যে কোনো দ্বি-মত নেই। সুতরাং এগুলো নিষিদ্ধ।

রাসূল (সা.) বলেছেন, “শেষ বিচারের দিন একজন মানুষকেও অগ্রসর হতে দেওয়া হবে না যতক্ষণ না সে হিসেব দেবে সে তার অর্জিত অর্থ কিভাবে খরচ করেছে।” ধুমপান, জর্দা সেবন প্রভৃতি মন্দ খাতে খরচ করলে আল্লাহর কাছে ধৃত হওয়া সমূহ সম্ভাবনা থেকে যাবে।

সন্দেহজনক বিষয়ও পরিত্যাজ্য:

নবী (সা.) বলেন, “হালাল স্পষ্ট, এবং হারাম স্পষ্ট। এ দুয়ের মাঝে আছে সন্দেহ জনক বিষয়াবলী (যা হালাল না হারাম অনেক মানুষই জানে না)। যে ব্যক্তি এ সন্দেহ জনক বিষয়গুলো পরিহার করল, সে তার দ্বীন ও স্বাস্থ্য রক্ষা করলো। আর যে এ সন্দেহ জনক বিষয়গুলোতে লিপ্ত হল সে প্রকারান্তরে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ল.. (বুখারী ও মুসলিম)।

প্রথম কথা হলো, ধুমপান ও জর্দা সেবন সন্দেহহীনভাবে ক্ষতিকর ও হারাম। তর্কের খাতিরে ধুমপান ও জর্দা সেবনকে হারাম না মানলেও বলা যায়, যারা ইসলামের দৃষ্টিতে ধুমপান ও জর্দা সেবন নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো প্রমাণ পাচ্ছেন না তারা অন্তত উপরিউক্ত হাদীসটির প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারেন। কারণ এ হাদীস মতে, ধুমপান ও জর্দা সেবনকে হালাল বা হারাম বলে সন্দেহ হলেও তা অবশ্যই বর্জনীয়।

উপকার না থাকলেই বর্জন করা উচিত:

রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে সকল কথা ও কাজ মানূষের কোনো উপকারে আসে না, তা পরিহার করা তার ইসলামের সৌন্দর্য।” (মুসলিম) আমরা সকলেই স্বীকার করি যে ধুমপান ও জর্দা সেবন কোনো উপকারে আসে না। বরং ক্ষতিই করে। কাজেই তা বর্জন করে ইসলামে সৌন্দর্য বজায় রাখতে হবে।

নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্যের অল্প গ্রহণও হারাম:

রাসূল (সা.) বলেন, যে বস্তু অধিক পরিমাণে গ্রহণ করলে নেশা সৃষ্টি হয়, তার সামান্য পরিমাণও হারাম। (আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, সহীহ)।

অধিক পরিমাণে নিকোটিন বা তামাক গ্রহণ নেশা সৃষ্টি করে- এটা এক প্রমাণিত সত্য। তাই এ হাদীসের আলোকে অল্প পরিমাণ ধুমপান ও জর্দা গ্রহণও হারাম হবে- কারণ এগুলোর অধিক পরিমাণ নেশা সৃষ্টি করে।

নেশা সম্পর্কিত আরও কিছু হাদীসে:

মাদকদ্রব্য তাই যা জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ করে (উল্লেখ্য, ধুমপান জ্ঞান-বুদ্ধি শতভাগ লোপ না করলেও কিছুটা লোপ করে।) (বুখারী)

নেশা সৃষ্টিকারী যে কোন দ্রব্যই মদ। আর যাবতীয় মদ হারাম (আবু দাউদ)।

মদপানকারী মদপানের সময় মুমিন থাকে না (বুখারী)।

মাদকাসক্ত ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না (নাসায়ী)।

মদের সাথে সম্পর্ক রাখে এমন দশ ব্যক্তির উপর মহানবী (সা.) লানত করেছেন: ১.যে নির্যাস বের করে ২.প্রস্তুতকারী ৩.পানকারী (/ব্যবহারকারী) ৪.যে পান করায় ৫.আমদানীকারক ৬.যার জন্য আমদানী করা হয় ৭.বিক্রেতা ৮.ক্রেতা ৯.সরবরাহকারী এবং ১০.লভ্যাংশ ভোগকারী। (তিরমিযী)

ধুমপায়ীর কাছে প্রশ্ন:

আপনি যদি ধুমপানকে হালাল মনে করেন- তবে তা কেনো মসজিদের মধ্যে বসে পান করেন না? কেনো মুরুব্বী ও সম্মানিত লোকদের সামনে ধুমপান করেন না? কেনো টয়লেট বা অপবিত্র স্থানে বসে ধুমপান করেন?

আপনি কি ধুমপানকে একটি নেয়ামত হিসেবে শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ্’ বলেন? আপনি কি একটি নেয়ামত লাভে ধন্য হয়েছেন তাই ধুমপান শেষ করে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলেন- যেমনটি আপনি হালাল পানাহারের সময় করে থাকেন?

সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ধুমপান ও নেশাদ্রব্য:

ধুমপান ও নেশাদ্রব্য গ্রহণের ফলে:

মানসিক তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, হতাশা, অবসাদ ও দুর্বলতা বাড়ে, অসংলগ্ন আচরণ ও উগ্র মেজাজ সৃষ্টি হয়; এমনকি নেশাগ্রস্ত মায়ের সন্তানও উগ্র স্বভাবের হয়ে থাকে।

ধুমপান ও নেশাদ্রব্য গ্রহণের ফলাফল হলো উচ্ছৃংখল আচরণ, চুরি, রাহাজানি ও অন্যান্য অপরাধ। সমাজে যারা বিভিন্ন অপরাধ করে বেড়ায় তাদের প্রায় ৯৮%-ই ধুমপান করে থাকে।

যারা মাদক দ্রব্য সেবন করে তাদের ৯৫%-ই প্রথমে ধুমপানে অভ্যস্ত হয়েছে তারপর মাদক সেবন শুরু করে থাকে। (মূলত যেনা হারাম হলেও দৃষ্টিপাত নামক সূত্রপাত বা প্রবেশদ্বারকেও হারাম করা হয়েছে)।

নেশার ফলে পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হয়, পরিবারকে আর্থিক অনটনে ফেলা হয়।

নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি আর্থিকভাবে নিজেও সর্বশান্ত হয়, অনেক সময় বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার নেয়, সময়মতো টাকা শোধ না করে সম্পর্কের অবনতি ঘটায় এমনকি শত্রুতাও সৃষ্টি করে।

নেশাগ্রস্ত হয়ে একজন দু:খী মানুষে পরিণত হয় এবং আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়।

ধুমপায়ীর ধুমপানকালীন সময়ে কোনো অধুমপায়ী উপস্থিত থাকলে তারও একই সমস্যা দেখা দেয়।

মদ, গাঁজা, আফিম, ফেনসিডিল, হেরোইন, মরফিন, পেথেড্রিন, কোকেন, চরস, হাশিশ, ভাং, মারিজুয়ানা, ভেলিয়াম, সোনারিল, মেনডেন, পলিটামিন, কোডেইন, সিগারেট, বিড়ি, তামাক, জর্দা ইত্যাদির চর্চা যদি বন্ধ করে দেওয়া যায় তাহলে অর্ধেক হাসপাতাল ও অর্ধেক জেলখানা আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে।

সর্বোপরি, ইসলামের দৃষ্টিতে নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির মৃত্যুর সময় ‘কালেমা’ নসীব (বা ঈমানের সাথে মৃত্যু) হয় না।

ধুমপান ও নেশাদ্রব্যের ক্ষতি প্রতিরোধের উপায় ও করণীয়:

ইসলামের বিধি-বিধান জেনে-বুঝে মেনে চলতে হবে।

মাতাপিতা বা অভিভাবকদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। যেমন- সন্তানকে জ্ঞান দান করা, অসৎ সঙ্গীদের থেকে দূরে রাখা ইত্যাদি।

ইমাম ও ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে।

চিকিৎসক, সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদদের সুচারুরূপে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

মজবুতভাবে ইসলামী আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে।

সর্বদা আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের চিন্তা লালনের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ইসলামে কোনো ভালো পদ্ধতির পথনির্দেশ দিলো, সে সেটির সওয়াব পাবে এবং সেই পদ্ধতি অনুযায়ী যারা কাজ করবে তাদের সওয়াবও সে পাবে, তাতে তাদের সওয়াবে কোনো কমতি হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো খারাপ পদ্ধতি প্রবর্তন করবে সে সেটির পাপ বহন করবে, এবং যারা সেই পদ্ধতি অনুসরণ করবে তাদের পাপও সে বহন করবে, তাতে তাদের পাপের কোনো কমতি হবে না।” (মুসলিম) কাউকে ধুমপান করালে কিংবা করা শেখালে উপরিউক্ত হাদীস অনুযায়ী আজীবন তার পাপ হতে থাকবে। পক্ষান্তরে, ধুমপান হারাম- এ কথা প্রচার করে মানুষকে তা থেকে বিরত রাখলে আজীবন তার সওয়াব হতে থাকবে। অর্থাৎ, ধারাবাহিক পুণ্য অর্জন ও পাপ বর্জনের ক্ষেত্রে এ হাদীস অনুযায়ী নিজেও ধুমপান ও যাবতীয় নেশা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং অন্যকেও ধুমপান ও যাবতীয় নেশা থেকে দূরে রাখতে হবে। আল্লাহ বলেন,“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা (বা প্রত্যাবর্তন) করো, একেবারে বিশুদ্ধ তাওবা যাতে আল্লাহ তোমাদের ক্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করে দেন এবং তোমাদেরকে সেই জান্নাতে প্রবেশ করান যার পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত।” (৬৬/সূরা আত তাহরীম:৮)

ধুমপান ও জর্দা সেবন সম্পর্কিত ফতোয়া:

ধুমপান সম্পর্কে সমাজে যতো ধরনের মতামতই প্রচলিত থাকুক না কেনো তা সম্পূর্ণরূপে হারাম।

ধুমপান করা, এর সামগ্রী বিক্রি করা ও ধুমপানকে উৎসাহ দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম।

ধুমপান হারাম হওয়ার কারণে কোনো মহিলা যদি তার স্বামীকে ধুমপান ত্যাগ করতে বলে এবং স্বামী যদি তা ত্যাগ না করে, তাহলে সেই মহিলা যে কোনো সময় তার স্বামীকে ত্যাগ করতে পারে। এটা তার দ্বীনি (তথা ধর্মীয়) অধিকার।

যাকে অর্থ প্রদান করলে সে ধুমপান বা এ জাতীয় মন্দ খাতে খরচ করবে বলে বুঝা যাবে- তাদেরকে অর্থ প্রদান করা উচিত নয়। আল্লাহ বলেন, “আর যে সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জীবন যাত্রার অবলম্বন করেছেন, তা অর্বাচীনদের হাতে তুলে দিও না।” (৪/সূরা আন নিসা:৫)

তামাক চাষ, তা বিক্রি করা এবং ব্যবহার করা জায়েয নেই। কারণ তা বিভিন্ন দিক দিয়ে হারাম। এতে শারীরিক ক্ষতি রয়েছে, তা অপবিত্র এবং এতে কোনো উপকার নেই। কাজেই মুসলিমের উচিত হলো তা পরিত্যাগ করে এ থেকে দূরে থাকা এবং তা চাষ ও এর ব্যবসা না করা। কেননা আল্লাহ কোনো জিনিসকে হারাম করলে এর মূল্যকেও হারাম করেন। তাছাড়া ইসলামের অন্যতম ও স্বাভাবিক মূলনীতি হলো, আল্লাহ কোনো হারাম জিনিসের মধ্যে এ উম্মতের কোনো চিকিৎসা রাখেননি। তাই, সার্বিক বিচারে, সিগারেট, জর্দা ইত্যাদি তৈরির কারখানায় কাজ করা জায়েয নয়। কারণ সেগুলো তৈরি এবং তা কেনাবেচা সংশ্লিষ্ট লেনদেন করা হারাম। আর এ ধরনের কোম্পানীতে কাজ করা হারামে সহযোগিতার শামিল। আল্লাহ বলেন, “তোমরা পরস্পরে ভাল এবং তাকওয়াপূর্ণ কাজে সহযোগিতা কর, পক্ষান্তরে পাপ এবং আল্লাহদ্রোহী কাজে সহযোগিতা করো না।” (৫/সূরা আল মায়িদা:২) কাজেই এ জাতীয় কোম্পানীতে কাজ চালিয়ে যাওয়া হারাম এবং এর পারিশ্রমিকও হারাম। মুসলিমদের উচিত এ ধরনের কোম্পানীর কাজ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর নিকট তাওবা (প্রত্যাবর্তন) করা। হালাল কাজ করে অল্প উপার্জন করা অধিক পরিমাণ হারাম উপার্জনের চেয়ে বহুগুণ উত্তম। তাছাড়া আরেকটি জরুরী কথা হলো, অর্জিত সম্পদ হারাম হলে ইবাদাত ও দুআ কবুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাবে না।

বাস্তবতা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শরীয়াতের দৃষ্টিতে পান খাওয়া:

হজমে সহায়তা ও মুখের স্বাদ বর্ধন ইত্যাদি উপকার গ্রহণের জন্য সুপারী, চুন, জর্দা, খয়ের ইত্যাদি ছাড়া কেবল প্রয়োজন পরিমাণ পান পাতা কাউকে খেতে দেখা যায় না। যারা খায় তারা সুপারী, চুন, জর্দা ও খয়ের ইত্যাদি কিছু না কিছু সহই খায়। তাই, পান বলতে কেবল পান পাতা বুঝালেও প্রচলিত অর্থে পান বলতে পান পাতার সাথে সাথে সুপারি, চুন, জর্দা, খয়ের ইত্যাদির মিশ্রণকেই বুঝায়। আর চুন, সুপারী, খয়ের, জর্দা ইত্যাদি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের কারোর কোনো দ্বিমত নেই। যখন কোনো রোগী ডাক্তারের কাছে যায় তখন ডাক্তার তাকে প্রায়ই পান ত্যাগ করার পরামর্শ দেন। কোনো ডাক্তার সুস্থ্য হওয়ার জন্য কাউকে পান খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলে সাধারণত শোনা যায়না। তাই, সার্বিক বিচারে, পান খাওয়ায় ক্ষতির দিকটাই প্রবল।

ভারত উপমহাদেশের অনেক আলেম পান খেয়ে থাকেন। বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত তথা আলেম সমাজ ও মাদরাসা ছাত্রদের মধ্যে পান খাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তাদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৪০ জন পান খেয়ে থাকেন। তারা বিড়ি, সিগারেট, গাজা, মদ ইত্যাদি না খেয়ে যে সুনাম অর্জন করেছেন পান খেয়ে যেনো তার ‘কাফফারা’ (প্রায়শ্চিত্য, দূর করা, পরিপূরক, দায়মুক্তি..) আদায় করতে চান! অথচ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পান খাওয়া ছাত্র-ছাত্রী খুব একটা চোখে পড়ে না। অবশ্য সেখানে সিগারেট বা অন্য নেশার প্রচলন আছে। আলেম ও তার ছাত্রদের পান খেতে দেখে মূর্খ লোকেরা অনেক সময় ভাবে, পান খাওয়া বোধ হয় খুব পুণ্যের বা বরকতের কাজ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পান দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন প্রায় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পান খাওয়ায় পুণ্যের কোনোই সম্ভাবনা নেই বরং আছে পাপ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।

বাংলাদেশের অনেক আলেম পান খাওয়াকে জায়েয মনে করেন। কিন্তু আরব দেশের আলেমগণ পান খাওয়াকে হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। এ কারণে সৌদি আরবে পান খাওয়া সরকারীভাবে নিষিদ্ধ। আমাদের দেশের পানখোররা অনেক সময় ঐ সকল দেশে গেলে প্রায় ৬-৭ দিরহাম দিয়ে একটি পান কিনে থাকে। প্রয়োজনে বাথরুমে গিয়ে পান খেয়ে বাইরে বের হয়; যেমনটা বের হয় বাংলাদেশে ফেনসিডিল খাওয়ার বেলায়।

পান খায়না এমন বাসায় পান খেতে অভ্যস্ত কোনো মেহমান এলে সে অনেক সময় পরিষ্কার ঘরে পানের চিপটি (বা পিক) ফেলে। অনেক সময় বিছানার চাদরে দাগ পড়ে যায়, বেসিন লালচে হয়ে যায় এবং পরিবেশ নোংরা হয়ে পড়ে। তাছাড়া পান খাওয়া লোকদের আসা-যাওয়া বেশি হলে সে এলাকাটাই সাধারণত নোংরা থাকে। অন্যদিকে পানখোরের পাশে পান না খাওয়া লোক সলাত আদায় করলে পানখোরের মুখের দুর্গন্ধে প্রতিবেশীর কষ্ট হয়। আর প্রতিবেশী বা সহযাত্রীর কষ্ট হয় এমন কোন কাজ করা ইসলামে জায়েয নয়।

একটু চিন্তা করলে বুঝা যায়, বিভিন্ন উদ্ভিদের কাণ্ড ও পাতা চতুষ্পদ প্রাণীর পছন্দের খাদ্য। কিন্তু মানুষ সাধারণ সেগুলো না খেয়ে খায় ফল। তবে কিছু কিছু কাণ্ড ও পাতা আছে যা পশু ও মানুষ উভয়ই খেলেও পশু খায় কাঁচা আর মানুষ খায় সেদ্ধ করে। অথচ, পান নামক কাঁচা পাতা নির্দ্বিধায় অনেক মানুষ খেয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় বরং পানের সাথে জর্দা নামক আরও একটি জঘন্য তামাকজাত পদার্থও তারা খেয়ে যাচ্ছে। এ নোংরা ও ক্ষতিকর দ্রব্যের পক্ষে কিছু অর্বাচীন আবার হাদীস থেকে তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করে। হাদীসের তথ্যে পাওয়া যায় যে, শুধুমাত্র একটি যুদ্ধে সৈনিকগণ (যারা সাহাবী ছিলেন) তাদের ক্ষুধা নিবারণের জন্য কাঁচা পাতা খেয়ে জীবন রক্ষায় সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু আজকাল ভারত উপমহাদেশের পান খাওয়ায় অভ্যস্ত লোকেরা কোন ধরনের জীবন রক্ষার প্রচেষ্টায় লিপ্ত? বরং অনেকে পানের নেশায় এতোই আসক্ত যে, তারা প্রয়োজনে ভাত এক বেলা কম খাবে, কিন্তু যথাসময়ে পান তাদের চাই-ই চাই।

পান খাওয়ার আদেশ ও উৎসাহ ইসলামে নেই। বরং কিছু কারণে ও শর্তে সেটা মাকরুহ থেকে হারাম পর্যায়ে চলে যেতে পারে। পান খাওয়ায় রয়েছে অনেক ধরনের ক্ষতি। যেমন:

দাঁতের স্বাভাবিক রং বিনষ্ট হওয়া:

পান খেলে মানুষের দাঁতের রং কুৎসিত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়।

রাসূল (সা.) জীবনে মাত্র চার বার দাঁত বের করে হেসেছিলেন। আর সেই সময় সাহাবী (রা.) দের মধ্যে যারা তাঁর হাসিমুখ অবস্থায় দাঁত দেখেছিলেন, তাঁরা নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান মনে করতেন।

রাসূল (সা.) এর দাঁত কি আমাদের দেশের পানখোরদের দাঁতের মতো নোংরা ছিলো? কখনই তা হতে পারে না।

রাসূল (সা.) দাঁতকে সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন।

যিনি পান খেয়ে থাকেন তিনি শত চেষ্টা করেও দাঁতকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারেন না।

একটু বিবেক দিয়ে কল্পনা করুন যে, রাসূল (সা.) এর কাছে কোনো ব্যক্তি পান চিবুতে চিবুতে এলে তিনি কি বলতেন? (ক)‘খুব ভাল জিনিষ খাচ্ছো, আমাদেরও পান খেতে দাও’ নাকি (খ)‘পান খেয়ে মুখ ও দাঁতে আল্লাহর দেওয়া স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করো না’?

মুখে সুপারীজনিত দুর্গন্ধ:

অনেকে পানের সাথে পচা বা মজে যাওয়া সুপারি খায়, যার গন্ধ প্রায়ই মানব বিষ্ঠার চেয়েও বেশি খারাপ। পান খাওয়া ব্যক্তি নিয়মিত এই দুর্গন্ধ-যুক্ত সামগ্রী খেয়ে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে হয়তো গন্ধ উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু যারা পান খায় না, তারা টের পায় যে গন্ধটি কতো জঘন্য।

রাসূল (সা.) বলেছেন যে, “তোমাদের মধ্যে কেউ যেনো দুর্গন্ধ যুক্ত সামগ্রী (যেমন: কাঁচা পিয়াজ, কাঁচা রশুন) খেয়ে মসজিদে প্রবেশ না করে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে দুর্গন্ধ মুক্ত না হয়।” আর বর্তমানে কিছু নামাযী পান-সিগারেট খেয়ে মসজিদে প্রবেশ করার পর তাদের পাশে কেউ নামাজে দাঁড়ালে তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় যে গন্ধ বের হয়, তাতে পার্শ্ববর্তী ব্যক্তির নি:শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তাই রাসূল (সা.) এর আদেশ যে ব্যক্তি মানতে পারলো না, তার জন্য মসজিদে যাওয়া ঠিক নয়, যদিও সে ‘মাওলানা’ উপাধিধারী আলেমও হন।

সুপারিসহ পান খেলে মুখের ক্যান্সার হতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সুপারি দিয়ে পান খেলে মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি ৯.৯ গুণ (জর্দাসহ) ও ৮.৪ গুণ (জর্দা ছাড়া)।

সুপারী নেশা উদ্রেক করে। যিনি সুপারী খেতে অভ্যস্ত নন তিনি সুপারী খাওয়ার সাথে সাথে কিছুটা বেহুঁশ হয়ে পড়েন।

সুপারির উত্তেজক পদার্থকে নিকোটিনের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

সুপারি খেলে তাৎক্ষণিকভাবে যে সমস্যা হতে পারে তা হল- (ক)অ্যাজমা বেড়ে যেতে পারে। (খ)রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে (গ)নাড়ির স্পন্দনের হার বেড়ে গিয়ে অস্থিরতা অনুভূত হতে পারে।

তামাকমিশ্রিত জর্দা:

(চা বাগানে) কিছু পোকা আছে, যেগুলো বিষ প্রয়োগেও মরে না, সেগুলো তামাকের পাতা ভিজানো পানি দিয়ে নিধন করতে হয়। তাহলে সহজেই বুঝা যায় এ ক্ষেত্রে বিষের চেয়ে অধিক শক্তিশালি বিষাক্ত দ্রব্য হলো তামাক পাতা। সেই তামাক পাতাই আমাদের অনেকে গুল হিসাবে সরাসরি ব্যবহার করে আবার জর্দা হিসেবে পানের সাথে খেয়ে থাকে।

যারা পানের সঙ্গে তামাক জাতীয় দ্রব্যাদি গ্রহণ করেন, তাদের সাধারণের চেয়ে ৫ গুণ বেশি মুখে ক্যান্সার হওয়ার আশংকা থাকে।

জর্দা বিষাক্ত, তাই এতে যতো সুগন্ধি মেশানোই হোকনা কেনো তা জীবনের সৌরভ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনে।

চুন:

চুন কোনো খাদ্যের মধ্যে পড়ে না। তারপরও কেউ চুন খেলে মুখে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।

অতিরিক্ত চুন জিহ্বাকে পুড়িয়ে ফেলে এবং জিহ্বার স্বাদ গ্রহণ প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

চুন পিত্তথলিতে পাথর তৈরিতে সহায়তা করে।

চুন খেলে চোখের মণি সংকুচিত হতে পারে।

পানে বেশিমাত্রায় চুন খেলে দাঁতের ক্ষতি হয়।

খয়ের:

পানের সঙ্গে বেশি খয়ের খেলে ফুসফুসে ইনফেকশান হয়।

খয়ের মুখের অভ্যন্তরের আবরণীকে সংকুচিত করে।

পান খাওয়া মানেই অপব্যয় ও অনর্থক কাজ- যা পরিহার করা ইসলামের দাবী।

ধুমপান বর্জনের মতো পান খাওয়ার অভ্যাসও ত্যাগ করা উচিত।

ধুমপায়ী ব্যক্তিরা তামাকের পাতা খায় পুড়িয়ে ধোয়া করে, আর (জর্দাসহ) পান খাওয়া মানুষ তামাক খায় অপেক্ষাকৃত সরাসরি। এ বিচারে পানের জর্দার ক্ষতি ধুমপানের চেয়েও বেশি।

শেষকথা:

এ লেখায় ধুমপান ও জর্দা সেবনকে হারাম প্রমাণের জন্য দলীল হিসেবে কোনো মনীষীর উক্তি বা বিজ্ঞানীর কোনো লেখা দেওয়া হয়নি। দলীল দেওয়া হয়েছে কুরআন ও হাদীস থেকে। যা নিশ্চিতভাবেই অন্য সকল দলীলের উর্ধ্বে। তাই, এতোদিন না জেনে বা ভুল জেনে যারা ধুমপান বা জর্দা সেবনের হারাম কাজ করেছেন তারা আজ জানার পর সঙ্গে সঙ্গে এই হারাম বস্তু চিনতরে ত্যাগ করবেন এবং সকলকে ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করবেন ইনশাআল্লাহ।

লেখার সূত্র

লেখাটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করতে চাইলে ক্লিক করুন।

মতামত দিন