ইসলামের ইতিহাস

রমযান মাসের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও এর কিছু শিক্ষা (প্রথম পর্ব)

 রমযান মাসের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও এর শিক্ষা

রহমত, মাগফিতার ও নাজাতের পয়গাম নিয়ে প্রতি বছর আমাদের দুয়ারে ফিরে আসে রমযান। মানবসৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকেই এ মাসে সংঘটিত হয়েছে অসংখ্য ঘটনা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এ মাসেই নাযিল হয়েছে। বিজয়ের মাসখ্যাত রমযানেই মুসলিমগণ বদরের প্রান্তরে কাফিরদের পরাজিত করে ইসলামের বিজয় নিশান উড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্বের দরবারে। রমযানের নানা ঘটনাতে রয়েছে আমাদের মূল্যবান উপদেশ ও শিক্ষা। আল-কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা পূর্ববর্তী নবী রাসূলদের ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন,

﴿وَكُلّٗا نَّقُصُّ عَلَيۡكَ مِنۡ أَنۢبَآءِ ٱلرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِۦ فُؤَادَكَۚ وَجَآءَكَ فِي هَٰذِهِ ٱلۡحَقُّ وَمَوۡعِظَةٞ وَذِكۡرَىٰ لِلۡمُؤۡمِنِينَ١٢٠﴾ [هود: ١٢٠]

“আর রাসূলদের এসকল সংবাদ আমরা তোমার কাছে বর্ণনা করছি যার দ্বারা আমরা তোমার মনকে স্থির করি, আর এতে তোমার কাছে এসেছে সত্য এবং মুমিনদের জন্য উপদেশ ও স্মরণ”। [সূরা হূদ, আয়াত: ১২০]

﴿كَذَٰلِكَ نَقُصُّ عَلَيۡكَ مِنۡ أَنۢبَآءِ مَا قَدۡ سَبَقَۚ وَقَدۡ ءَاتَيۡنَٰكَ مِن لَّدُنَّا ذِكۡرٗا ٩٩ مَّنۡ أَعۡرَضَ عَنۡهُ فَإِنَّهُۥ يَحۡمِلُ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ وِزۡرًا١٠٠﴾ [طه: ٩٩،  ١٠٠]

“পূর্বে যা ঘটে গেছে তার কিছু সংবাদ এভাবেই আমরা তোমার কাছে বর্ণনা করি। আর আমরা তোমাকে আমার পক্ষ থেকে উপদেশ দান করেছি। তা থেকে যে বিমুখ হবে, অবশ্যই সে কিয়ামতের দিন পাপের বোঝা বহন করবে।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৯৯-১০০]

অতএব, ঘটনা শুধু জানানোর জন্যই এখানে উল্লেখ করা উদ্দ্যেশ্য নয়; বরং এর থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া মূল লক্ষ্য। আলোচ্য প্রবন্ধে রমযানের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও শিক্ষা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

১ রমযান:

ক- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত লাভ:

রমযান মাসকে আল্লাহ তা‘আলা আসমানী কিতাবসমূহের নাযিলের মাস হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এ মাসেই নাযিল হয় মানবতার মুক্তির দিশারী সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব ‘আল-কুরআন’। ইবন ইসহাকের মতে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে হেরা গুহায় জিবরীল ‘আলাইহিস সালামের আগমনে অহীপ্রাপ্ত হন[1]। তাঁকে বলা হলো:

﴿ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ ١ خَلَقَ ٱلۡإِنسَٰنَ مِنۡ عَلَقٍ ٢ ٱقۡرَأۡ وَرَبُّكَ ٱلۡأَكۡرَمُ ٣ ٱلَّذِي عَلَّمَ بِٱلۡقَلَمِ ٤ عَلَّمَ ٱلۡإِنسَٰنَ مَا لَمۡ يَعۡلَمۡ٥﴾ [العلق: ١،  ٥]

“পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক থেকে। পড়, আর তোমার রব মহামহিম, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে তা শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।” [সূরা আল-‘আলাক, আয়াত: ১-৫]

ইবন ইসহাক দলীল হিসেবে এ আয়াত পেশ করেন,

﴿شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ هُدٗى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٖ مِّنَ ٱلۡهُدَىٰ وَٱلۡفُرۡقَانِۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ ٱلشَّهۡرَ فَلۡيَصُمۡهُۖ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوۡ عَلَىٰ سَفَرٖ فَعِدَّةٞ مِّنۡ أَيَّامٍ أُخَرَۗ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلۡيُسۡرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلۡعُسۡرَ وَلِتُكۡمِلُواْ ٱلۡعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡ وَلَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ١٨٥﴾ [البقرة: ١٨٥]

“রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। আর যে অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে তবে অন্যান্য দিবসে সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না। আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা শোকর করো।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫]

খ- ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালাম সহীফাপ্রাপ্ত হন:

ওয়াসেলাহ ইবন আসকা‘ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“أُنْزِلَتْ صُحُفُ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي أَوَّلِ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ، وَأُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ لِسِتٍّ مَضَيْنَ مِنْ رَمَضَانَ، وَالْإِنْجِيلُ لِثَلَاثَ عَشْرَةَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ، وَأُنْزِلَ الْفُرْقَانُ لِأَرْبَعٍ وَعِشْرِينَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ “.

“রমযানের প্রথম রাতে ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালামের ওপর সহিফাসমূহ নাযিল হয়, রমযানের ছয়দিন অতবাহিত হলে (৭ রমযান) মূসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর তাওরাত নাযিল হয়, তেরই রমযান অতিবাহিত হলে (১৪ রমযান) ঈসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর ইঞ্জীল নাযিল হয়, আর ২৫ রমযান মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আল-কুরআন নাযিল হয়।”[2]

রমযানে আসমানী কিতাবসমূহ নাযিলের হিকমত:

বরকতময় মাস রমযানে আল্লাহ তা‘আলা অধিকাংশ আসমানী কিতাব নাযিল করেন। এ মাসকে আল্লাহ অন্যান্য মাসের ওপর মর্যাদা দান করেছেন। আর সে মর্যাদার কারণেই মর্যাদাময় কিতাবসমূহ এ মাসেই নাযিল করেছে। আমলের মাসে এসব কিতাব নাযিল করে এর অনুসারীদেরকে আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করাই মূললক্ষ্য।

গ- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাইনাব বিনতে খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে বিয়ে:

৩য় হিজরীর ১ রমযান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী হিলাল এর যাইনাব বিনতে খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে বিয়ে করেন। তিনি ১ রমযানই তাঁর সাথে বাসর করেন। [3]

ঘ- সালাতুল ইসতিসকা প্রচলন:

ইবন হিব্বান রহ. তাঁর সিকাত গ্রন্থে বলেন, মানুষের বৃষ্টির অতিপ্রয়োজন দেখা দিলে ১ রমযান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতুল ইসতিসকা আদায় করতে বের হন। তিনি দু রাক‘আত সালাত আদায় করেন এবং উচ্চস্বরে কিরাত পড়েন। অতপর কিবলামুখী হয়ে চাদর উল্টিয়ে দু‘আ করেন। ইমাম আহমদ রহ. এর মতে এটা ৬ষ্ঠ হিজরীর রমযান মাসে সংঘটিত হয়েছিল।[4]

২ রমযান:

ক- মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা:

৮ হিজরীর ২ রমযান, ৬২৯ খৃস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে রওয়ানা করেন।

খ- কায়রোয়ান শহরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন:

৬৭০ খৃস্টাব্দের ২ রমযান উকবা ইবন ‘আমের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর নেতৃত্বে তিউনেসিয়ার ঐতিহাসিক কায়রোয়ান শহরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।

গ- আব্বাসী খিলাফাতের গোড়াপত্তন:

১৩২ হিজরীর ২য় রমযান (১৩ এপ্রিল ৭৫০ খৃ.) আবুল আব্বাস আব্দুল্লাহর খিলাফরে আরোহণের মাধ্যমে আব্বাসী খিলাফতের গোড়াপত্তন হয় এবং উমাইয়া শাসনের অবসান ঘটে।

ঘ- আসকালান শহর ধ্বংসকরণ:  

সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী ১১৯১ খৃস্টাব্দে ২ রমযান ক্রুসেডারদের আক্রমন প্রতিহত করতে আসকালান শহর ধ্বংস করে দেন, যাতে সেখানে পুনরায় খৃস্টানরা বসতি স্থাপন করে বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করতে না পারে। তিনি এ শহর ধ্বংসকালে ঐতিহাসিক এক বচন ব্যক্ত করেন। তিনি বলেছিলেন: ‘আল্লাহর কসম, এ শহরের একটি পাথর ধ্বংস করার চেয়ে আমার সব সন্তানের মৃত্যু আমার পক্ষে সহজতর’।

৩ রমযান:

ক- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের জন্য বের হন:

২ হিজরীর ৩ রমযান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদরের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে রওয়ানা হন।

খ- ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার মৃত্যু:

জান্নাতী নারীদের সর্দার, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী, হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার জননী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নয়নের মণি কলিজার টুকরা ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা একাদশ হিজরীর ৩ রমযান মঙ্গলবার (৬৩২ খৃ.) রজনীতে মারা যান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পরে তাঁর পরিবারের মধ্যে সর্বপ্রথম তিনিই মারা যান। মুহাম্মাদ ইবন উমার রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«تُوُفِّيَتْ فَاطِمَةُ بِنْتُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِثَلَاثِ لَيَالٍ خَلَوْنَ مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ وَهِيَ ابْنَةُ تِسْعٍ وَعِشْرِينَ سَنَةً أَوْ نَحْوَهَا» وَقَدِ اخْتُلِفَ فِي وَقْتِ وَفَاتِهَا “، فَرُوِيَ عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ مُحَمَّدِ بْنِ عَلِيٍّ أَنَّهُ قَالَ: «تُوُفِّيَتْ فَاطِمَةُ بَعْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلَاثَةِ أَشْهُرٍ» ، وَأَمَّا عَائِشَةُ فَإِنَّهَا قَالَتْ فِيمَا رُوِيَ عَنْهَا: «أَنَّهَا تُوُفِّيَتْ بَعْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسِتَّةِ أَشْهُرٍ» ، وَأَمَّا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الْحَارِثِ فَإِنَّهُ قَالَ: فِيمَا رَوَى يَزِيدُ بْنُ أَبِي زِيَادٍ عَنْهُ، قَالَ: «تُوُفِّيَتْ فَاطِمَةُ بَعْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَمَانِيَةِ أَشْهُرٍ».

“ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের তিনরাত অতিবাহিত হলে ২৯ বছর বয়সে মারা যান। আলিমগণ তাঁর মৃত্যু তারিখের ব্যাপারে মতানৈক্য করেছেন। আবূ জাফর মুহাম্মাদ ইবন আলী বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর তিনমাস পরে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা মারা যান। আর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর ছয়মাস পরে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা মারা যান। অন্যদিকে আব্দুল্লাহ ইবন হারিস রহ. ইয়াযিদ ইবন আবূ যিয়াদ থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর আটমাস পরে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা মারা যান।”[5]

৪ রমযান:

সিইফুল বাহার অভিযান:

মুসলিমদের বিজয়ের ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল এ রমযান মাস দিয়েই। মক্কা থেকে মদীনা হিজরতের পর হিজরী ১ম সালে হামজা ইবন আব্দুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে রমযান মাসে (মার্চ ৬২৩ খৃস্টাব্দ) ৩০জন মর্দে মুজাহিদের সমন্বয় ‘সিইফুল বাহার’ অভিযানে মুসলিমগণ সফলতা লাভ করেন। এ অভিযানের ফলে ইসলামের চিরশত্রু আবূ জাহলদের মনে ভীতির সঞ্চয় হয়। জাবির ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«بَعَثَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلاَثَ مِائَةِ رَاكِبٍ أَمِيرُنَا أَبُو عُبَيْدَةَ بْنُ الجَرَّاحِ نَرْصُدُ عِيرَ قُرَيْشٍ»، فَأَقَمْنَا بِالسَّاحِلِ نِصْفَ شَهْرٍ، فَأَصَابَنَا جُوعٌ شَدِيدٌ حَتَّى أَكَلْنَا الخَبَطَ، فَسُمِّيَ ذَلِكَ الجَيْشُ جَيْشَ الخَبَطِ، فَأَلْقَى لَنَا البَحْرُ دَابَّةً يُقَالُ لَهَا العَنْبَرُ، فَأَكَلْنَا مِنْهُ نِصْفَ شَهْرٍ، وَادَّهَنَّا مِنْ وَدَكِهِ حَتَّى ثَابَتْ إِلَيْنَا أَجْسَامُنَا، فَأَخَذَ أَبُو عُبَيْدَةَ ضِلَعًا مِنْ أَضْلاَعِهِ، فَنَصَبَهُ فَعَمَدَ إِلَى أَطْوَلِ رَجُلٍ مَعَهُ، قَالَ سُفْيَانُ: «مَرَّةً ضِلَعًا مِنْ أَضْلاَعِهِ فَنَصَبَهُ وَأَخَذَ رَجُلًا وَبَعِيرًا فَمَرَّ تَحْتَهُ» قَالَ جَابِرٌ: وَكَانَ رَجُلٌ مِنَ القَوْمِ نَحَرَ ثَلاَثَ جَزَائِرَ، ثُمَّ نَحَرَ ثَلاَثَ جَزَائِرَ ثُمَّ نَحَرَ ثَلاَثَ جَزَائِرَ، ثُمَّ إِنَّ أَبَا عُبَيْدَةَ نَهَاهُ وَكَانَ عَمْرٌو يَقُولُ: أَخْبَرَنَا أَبُو صَالِحٍ، أَنَّ قَيْسَ بْنَ سَعْدٍ قَالَ لِأَبِيهِ: كُنْتُ فِي الجَيْشِ فَجَاعُوا، قَالَ انْحَرْ، قَالَ: نَحَرْتُ، قَالَ: ثُمَّ جَاعُوا، قَالَ: انْحَرْ، قَالَ: نَحَرْتُ، قَالَ: ثُمَّ جَاعُوا، قَالَ انْحَرْ قَالَ: نَحَرْتُ، ثُمَّ جَاعُوا، قَالَ: انْحَرْ، قَالَ: نُهِيتُ.

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের তিনশত সাওয়ারীর একটি সৈন্যবাহিনীকে কুরাইশের একটি কাফেলার ওপর সুযোগমতো আক্রমন চালানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন। আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ছিলেন আমাদের সেনাপতি। আমরা অর্ধমাস পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতে অবস্থান করলাম। (ইতোমধ্যে রসদপত্র নিঃশেষ হয়ে গেল) আমরা ভীষণ ক্ষুধার শিকার হয়ে গেলাম। অবশেষে ক্ষুধার যন্ত্রনায় গাছের পাতা পর্যন্ত খেতে থাকলাম। এ জন্যই এ সৈন্যবাহিনীর নাম রাখা হয়েছে ‘জাইশুল খাবাত’ অর্থাৎ পাতা ওয়ালা সেনাদল। এরপর সমুদ্র আমাদের জন্য আম্বর নামক একটি প্রাণি নিক্ষেপ করল। আমরা অর্ধমাস ধরে তা থেকে খেলাম। এর চর্বি শরীরে লাগালাম। ফলে আমাদের শরীর পূর্বের ন্যায় হৃষ্টপুষ্ট হয়ে গেল। এরপর আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আম্বরটির শরীর থেকে পাঁজর ধরে খাড়া করালেন। এরপর তাঁর সাথীদের মধ্যকার সবচেয়ে লম্বা লোকটিকে আসতে বললেন। সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আরেক বর্ণনায় বলেছেন, আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আম্বরটির পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্য থেকে একটি হাড় ধরে খাড়া করালেন। এবং (ঐ) লোকটিকে উটের পিঠে বসিয়ে এর নিচে দিয়ে অতিক্রম করালেন। জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, সেনাদলের এক ব্যক্তি (খাদ্যের অভাব দেখে) প্রথমে তিনটি উট যবেহ্ করেছিলেন। এরপর আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাকে (উট যবেহ্ করতে) নিষেধ করলেন। আমর ইবন দীনার রহ. বলতেন, আবু সালিহ রহ. আমাদের জানিয়েছেন যে, কায়স ইবন সা‘দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু (অভিযান থেকে ফিরে এসে) তার পিতার কাছে বর্ণনা করছিলেন যে, সেনাদলে আমিও ছিলাম, এক সময়ে সমগ্র সেনাদল ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ল, (কথাটি শোনামাত্র কায়সের পিতা) সা’দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, এমতাবস্থায় তুমি উট যবেহ্ করে দিতে। কায়স রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, (হ্যাঁ) আমি উট যবেহ করেছি। তিনি বললেন, তারপর আবার সবাই ক্ষুধার্ত হয়ে গেল। এবারো তার পিতা বললেন, তুমি যবেহ্ করতে। তিনি বললেন, (হ্যাঁ) যবেহ করেছি। তিনি বললেন, তারপর আবার সবাই ক্ষুধার্ত হল। সা’দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, এবারো উট যবেহ্ করতে। তিনি বললেন, (হ্যাঁ) যবেহ করেছি। তিনি বললেন, এরপরও আবার সবাই ক্ষুধার্ত হলো। সা‘দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, উট যবেহ করতে। তখন কায়স ইবন সা‘দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, এবার আমাকে (যবেহ করতে) নিষেধ করা হয়েছে”।[6]

৫ রমযান:

ক- আব্দুর রহমান আদদাখিলের জন্ম:

স্পেনের উমাইয়া শাসনের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুর রহমান আদদাখিল (সকরে কুরাইশ) ১১৩ হিজরীর ৫ রমযান মোতাবেক ৯ নভেম্বর ৭৩১ খৃস্টাব্দে দামেস্কে জন্মগ্রহণ করেন।

খ- সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর নির্দেশে নৌবাহিনী গঠন:

৫৭৮ হিজরীর ৫ রমযান সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী মিসরের আলেকজান্দ্রিয়াতে ইসলামী নৌবাহিনী গঠনের নির্দেশ দেন। ফলে কাঠের নৌকা ও সমরাস্ত্র তৈরি করে নৌবাহিনী গঠন করেন।

৬ রমযান:

ক- মূসা ‘আলাইহিস সালাম তাওরাত প্রাপ্ত হন:

ওয়াসেলাহ ইবন আসকা‘ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

“أُنْزِلَتْ صُحُفُ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي أَوَّلِ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ، وَأُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ لِسِتٍّ مَضَيْنَ مِنْ رَمَضَانَ، وَالْإِنْجِيلُ لِثَلَاثَ عَشْرَةَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ، وَأُنْزِلَ الْفُرْقَانُ لِأَرْبَعٍ وَعِشْرِينَ خَلَتْ مِنْ رَمَضَانَ “.

“রমযানের প্রথম রাতে ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালামের ওপর সহিফাসমূহ নাযিল হয়, রমযানের ছয়দিন অতিবাহিত হলে মূসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর তাওরাত নাযিল হয়, তেরই রমযান অতিবাহিত হলে ঈসা ‘আলাইহিস সালামের ওপর ইঞ্জীল নাযিল হয়, আর ২৫ রমযান মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আল-কুরআন নাযিল হয়।”[7]

খ- আমুরিয়া বিজয়:

২২৩ হিজরীর ৬ রমযান মোতাবেক ৩১ জুলাই ৮৩৮ খৃস্টাব্দে খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর শাসনামলে আমুরিয়ায় মুসলিমরা জয়লাভ করেন।

গ- মুহাম্মাদ ইবন কাসিমের সিন্ধু বিজয়:

৯২ হিজরীর ৬ রমযান মোতাবেক ৬৮২ খৃস্টাব্দ ১৪ই মে খলিফা ওয়ালীদ ইবন আব্দুল মালেকের আমলে বীর সেনানী মুহাম্মাদ ইবন কাসিম ভারত উপমহাদেশের সিন্ধু প্রদেশ বিজয় করেন। সিন্ধু বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামের শান্তির ছায়াতলে প্রবেশ করতে থাকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আশেপাশের দেশগুলো।

৭ রমযান:

ঐতিহাসিক আল-আযহার মসজিদ উদ্বোধন:

৩৬১ হিজরীর ৭ রমযান মোতাবেক ৯৭১ খৃস্টাব্দে মিসরের ঐতিহাসিক আল-আযহার মসজিদ সালাত ও দীনী ইলমের জন্য উদ্বোধন করা হয়।

৮ রমযান:

তাবুক যুদ্ধ:

৯ম হিজরীর ৮ রমযান মোতাবেক ১৮ সেপ্টেম্বর ৬৩০ খৃস্টাব্দ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ জিহাদ তাবুক যুদ্ধ করেন এবং একই মাসে যুদ্ধ শেষে বিজয়ী বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

শিক্ষা:

আল্লাহ রমযান মাসেই মুসলিমদেরকে বড় বড় অনেক বিজয় দান করেছেন। বদর, খন্দক, তাবুক, স্পেন, সিন্ধু ইত্যাদি ঐতিহাসিক বিজয় রমযান মাসেই সাধিত হয়েছিল। এ মাসে আল্লাহর সাহায্য মুমিনের অতি নিকটে। ইবাদত বন্দেগীর এ মাসে বেশি বেশি সৎকাজ করে আল্লাহর কাছে বিজয় প্রার্থনা করা উচিৎ। তাবুক যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে বিজয়ী বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

৯ রমযান:

সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ বিজয়:

২১২ হিজরীর ৯ রমযান মোতাবেক ১ সেপ্টেম্বর ৮২৭ খৃস্টাব্দে যিয়াদ ইবন আগলাবের নেতৃত্বে সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ জয় করেন এবং সেখানে ইসলামের নিশান উড়ান।

লেখকঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী

চলবে…………

তথ্যসূত্রঃ

[1] সীরাতে ইবন হিশাম, পৃ. ১/২৩৫।

[2] মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং ১৬৯৮৪, শুয়াইব আরনাউত হাদীসটিকে দ‘য়ীফ বলেছেন। জামেউস সগীর, হাদীস নং ১৪৯৭, আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন এবং সনদের রাবীদেরকে সিকাহ বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন, ইবন ‘আসাকেরে (২/১৬৭) আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস হাদীসের শাহেদ।

[3] সিকাত, ১/২২০, তাবাকাতুল কুবরা, ৮/১১৫।

[4] সিকাত, ইবন হিব্বান, ১/২৮৬।

[5] মুসতাদরাক হাকিম, হাদীস নং ৪৭৬১। হাদীসটি মাকতূ‘। তাছাড়া মুহাম্মাদ ইবন উমর হচ্ছেন ওয়াকিদী, তিনি হাদীসের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত ব্যক্তি নন।

[6] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৩৬১।

[7] মুসনাদ আহমদ, হাদীস নং ১৬৯৮৪, শুয়াইব আরনাউত হাদীসটিকে দ‘য়ীফ বলেছেন। জামেউস সগীর, হাদীস নং ১৪৯৭, আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন এবং সনদের রাবীদেরকে সিকাহ বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন, ইবন ‘আসাকেরে (২/১৬৭) আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস হাদীসের শাহেদ।

মতামত দিন