প্রবন্ধ যাকাত

যাকাত বিধানের সারসংক্ষেপ (প্রথম পর্ব)

যাকাতের অর্থ:

আরবী الزكاة ‘যাকাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বৃদ্ধি ও উন্নতি। যাকাত শব্দের আভিধানিক আরেকটি অর্থ হয় التطهير (তাতহির), যার বাংলা অনুবাদ পবিত্র করা। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿قَدۡ أَفۡلَحَ مَن زَكَّىٰهَا ٩﴾ [الشمس: 9]

“সে নিশ্চিত সফল হয়েছে যে তাকে (নফসকে) পবিত্র করেছে”। [সূরা আশ-শামস, আয়াত: ৯]

যাকাতের কারণে সম্পদ বৃদ্ধি পায়, তাই যাকাতকে যাকাত বলা হয়। যাকাতের কারণে নেকিও বর্ধিত হয়। আরেকটি কারণ হলো, যাকাত নফসকে কৃপণতার ন্যায় বদ অভ্যাস থেকে পবিত্র করে, তাই অভিধানের দ্বিতীয় অর্থও শরঈ‘ যাকাতে পাওয়া যায়।

ইসলামী পরিভাষায়, নির্দিষ্ট সম্পদের ভেতর শরী‘আত কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণকে যাকাত বলা হয়, যা বিশেষ শ্রেণি ও নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করতে হয়। জ্ঞাতব্য যে, কুরআন, সুন্নাহ ও মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যে যাকাত ফরয, এতে কারও দ্বিমত নেই।

যাকাতের প্রতি উৎসাহ প্রদান ও যাকাত না দেওয়ার পরিণতি:

১. আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيۡهِمۡۖ إِنَّ صَلَوٰتَكَ سَكَنٞ لَّهُمۡۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ١٠٣﴾ [التوبة: 103]

“তাদের সম্পদ থেকে সদকা নাও, এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে এবং তাদের জন্য দো‘আ কর, নিশ্চয় তোমার দো‘আ তাদের জন্য প্রশান্তিদায়ক”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩]

অপর আয়াতে তিনি বলেন:

﴿إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي جَنَّٰتٖ وَعُيُونٍ ١٥ ءَاخِذِينَ مَآ ءَاتَىٰهُمۡ رَبُّهُمۡۚ إِنَّهُمۡ كَانُواْ قَبۡلَ ذَٰلِكَ مُحۡسِنِينَ ١٦ كَانُواْ قَلِيلٗا مِّنَ ٱلَّيۡلِ مَا يَهۡجَعُونَ ١٧ وَبِٱلۡأَسۡحَارِ هُمۡ يَسۡتَغۡفِرُونَ ١٨ وَفِيٓ أَمۡوَٰلِهِمۡ حَقّٞ لِّلسَّآئِلِ وَٱلۡمَحۡرُومِ ١٩﴾ [الذاريات: 15-19]

“নিশ্চয় মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাতসমূহে ও ঝর্ণাধারায়, তাদের রব তাদের যা দিবেন তা তারা খুশীতে গ্রহণকারী হবে। ইতোপূর্বে এরাই ছিল সৎকর্মশীল। রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাতো। আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত। আর তাদের সম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক”। [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ১৫-১৯]

অপর আয়াতে তিনি বলেন:

﴿وَٱلَّذِينَ يَكۡنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلۡفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٖ ٣٤﴾ [التوبة:34]

“যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদেরকে বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৪]

অপর আয়াতে তিনি বলেন:

﴿وَلَا يَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَبۡخَلُونَ بِمَآ ءَاتَىٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ هُوَ خَيۡرٗا لَّهُمۖ بَلۡ هُوَ شَرّٞ لَّهُمۡۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُواْ بِهِۦ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۗ ١٨٠﴾ [آل عمران:180]

“আল্লাহ যাদেরকে তার অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর, বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর, যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কিয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮]

২. ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে ইয়ামান পাঠানোর সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন:

«إنك تأتي قوماً من أهل الكتاب، فادْعُهُم إلى شهادة أنْ لا إله إلا الله، وأني رسول الله، فإنْ هم أطاعوا لذلك، فأعْلِمْهُم أن الله افترض عليهم خمس صلوات في كل يوم وليلة، فإنْ هم أطاعوا لذلك، فأعْلِمْهُم أن الله افترض عليهم صدقة تُؤخَذ مِن أغنيائهم فتُرَدّ في فقرائهم، فإنْ هم أطاعُوا لذلك، فإيَّاكَ وَكَرَائِمُ أموالهم (يعني لا تأخذ الزكاة مِن أفضل أموالهم وأحَبّهَا إليهم كما سيأتي)، واتقِ دعوة المظلوم، فإنه ليس بينها وبين الله حِجاب».

“তুমি কিতাবিদের এক কওমের নিকট যাচ্ছ, অতএব, তাদেরকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আমি আল্লাহর রাসূল’ সাক্ষীর দিকে আহ্বান কর, যদি তারা এতে আনুগত্য প্রকাশ করে, তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, প্রত্যেক দিন ও রাতে আল্লাহ তাদের ওপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। যদি তারা এতে আনুগত্য প্রকাশ করে, তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ তাদের ওপর সদকা ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করে তাদেরই গরীবদের মাঝে বণ্টন করা হবে, যদি তারা এতে আনুগত্য প্রকাশ করে, তুমি তাদের দামী সম্পদ গ্রহণ করা পরিহার কর, (অর্থাৎ যে সম্পদ তাদের নিকট অতি উত্তম ও অধিক পছন্দনীয় যাকাত হিসেবে সেখান থেকে তুমি গ্রহণ করবে না, সামনে এ সম্পর্কে আলোচনা আসছে), আর মজলুমের দো‘আ থেকে বাঁচ। কারণ, তার মাঝে ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই”।[1]

যাকাত প্রত্যাখ্যানকারীর হুকুম

যাকাত ইসলামের একটি ফরয ও রুকন, যথাসম্ভব সম্পদের যাকাত দ্রুত বের করা ওয়াজিব। সকল আলিম একমত যে, যাকাত ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ। যদি কেউ জানে যাকাত ফরয, তারপরও যাকাত ফরয হওয়াকে অস্বীকার করে যাকাত প্রদান থেকে বিরত থাকে, সে কাফির ও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত। মুসলিম শাসকের দায়িত্ব কুফরির কারণে তাকে হত্যা করা। আর যদি সে নতুন মুসলিম হয় অথবা ইলম ও ইসলামী জ্ঞানের শহর থেকে দূরে অবস্থান করে, না-জানার কারণে তাকে অবকাশ দিবে, যদি সে মুসলিমদের পাশে থেকে না জানার দাবি করে, তার কথায় কর্ণপাত করা হবে না। কারণ, যাকাত ইসলামের অপরিহার্য বিধান, মুসলিম মাত্র সবাই তা জানে।

অতএব, যদি কেউ যাকাত ত্যাগ করে, শাসক জোরপূর্বক তার থেকে যাকাত আদায় করবে এবং তাকে শাসাবে ও শাস্তি দিবে। শাস্তির একটি উদাহরণ: যাকাত আদায় শেষে শাস্তিস্বরূপ তার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে নিবে, আর অর্ধেক সম্পদ দ্বারা উদ্দেশ্য যে সম্পদের যাকাত দেয় নি তার অর্ধেক। এটিই আলিমদের বিশুদ্ধ মত। উদাহরণত, কারও ওপর স্বর্ণ ও ফসল দু’টি বস্তুর যাকাত ফরয, সে ফসলের যাকাত দিয়েছে স্বর্ণের যাকাত দেয় নি, বরং কৃপণতা করেছে, তার ক্ষেত্রে শুধু স্বর্ণের ওপর শাস্তি হবে, যেমন তার থেকে জোরপূর্বক প্রথম স্বর্ণের যাকাত বের করবে, অতঃপর অবশিষ্ট স্বর্ণের অর্ধেক গ্রহণ করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«… وَمَن منعها فإنا آخِذُوها، وَشَطْرَ مالِهِ (يعني وآخِذوا نصف ماله أيضاً بعد الزكاة)، عَزمَة مِن عَزَمات ربنا تبارك وتعالى (يعني أنَّ هذا أمرٌ أوْجَبَهُ اللهُ تعالى على الحاكم)».

“আর যে যাকাত দিতে অস্বীকার করবে, আমরা সেটি গ্রহণ করব এবং আরও গ্রহণ করব তার সম্পদের অর্ধেক। (অর্থাৎ যাকাত শেষে অবশিষ্ট সম্পদ থেকে অর্ধেক গ্রহণ করব)। এটি আমাদের রবের কড়া নির্দেশ থেকে একটি নির্দেশ। (অর্থাৎ শাসকের ওপর বিধানটি আল্লাহ ওয়াজিব করে দিয়েছেন)”।[2]

বিভিন্ন প্রকার যাকাত:

বিভিন্ন প্রকার যাকাত রয়েছে, যেমন স্বর্ণের যাকাত, চেক ও ব্যাংক নোটের যাকাত, যাকাতুল ফিতর, ব্যবসায়ী পণ্যের যাকাত, গুপ্তধনের যাকাত, জীব-জন্তুর যাকাত এবং ফল ও ফসলের যাকাত।

যাকাত ফরয হওয়ার শর্তসমূহ:

১ম শর্ত: ব্যক্তির স্বাধীন হওয়া: যাকাত ফরয হওয়ার জন্য ব্যক্তির স্বাধীন হওয়া জরুরি, কারণ গোলাম-দাসের ওপর যাকাত ফরয নয়, তবে তাদের পক্ষ থেকে যাকাতুল ফিতর আদায় করা জরুরি, যার বর্ণনা সামনে আসছে।

২য় শর্ত: মুসলিম হওয়া

জ্ঞাতব্য যে, যাকাত ফরয হওয়ার জন্য ব্যক্তির সাবালিগ ও বিবেক সম্পন্ন হওয়ার জরুরি নয়। এটিই আলিমদের বিশুদ্ধ মত। অতএব, নাবালক ও পাগলের সম্পদে যাকাত ফরয। অভিভাবকগণ তাদের সম্পদ থেকে যাকাত বের করবেন।[3]

৩য় শর্ত: সম্পদ নিসাব পরিমাণ হওয়া: শরী‘আত কর্তৃক সম্পদের নির্দিষ্ট পরিমাণকে নিসাব বলা হয়। সম্পদ নির্দিষ্ট পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি হলে তাতে যাকাত ওয়াজিব। বিভিন্ন প্রকার সম্পদ যেমন স্বর্ণ, রূপা, ফসল ও জতুষ্পদ প্রাণীর যাকাতের নিসাব কি, সামনে তার আলোচনা আসছে।

৪র্থ শর্ত: নিসাব পরিমাণ সম্পদে হিজর এক বছর পূর্ণ হওয়া: কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لا زكاة في مالٍ، حتى يَحُول عليه الحَوْل».

“কোনো সম্পদেই যাকাত নেই, যতক্ষণ না তার ওপর এক বছর পূর্ণ হবে”।[4]

সম্পদ যেদিন নিসাব পরিমাণ হবে সেদিন থেকে হিজরী বছর গণনা শুরু করবে, তবে শর্ত হচ্ছে বছর শেষ পর্যন্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ স্থির থাকা অথবা ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হওয়া। যদি বছরের মধ্যবর্তী সম্পদ নিসাব থেকে কমে যায়, অতঃপর একই বছর পুনরায় নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে বিশুদ্ধ মতে দ্বিতীয়বার যখন সম্পদ নিসাব পরিমাণ হবে, তখন থেকে বছর গণনা শুরু করবে, প্রথম তারিখ গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ নিসাব থেকে সম্পদ কমে যাওয়ার কারণে বছর শেষ হয়ে গেছে। অধিকাংশ আলিমের মাযহাব এটি।

তবে কতক সম্পদ রয়েছে, যার যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য এক বছর পূর্ণ হওয়া জরুরি নয়। যেমন, জমি থেকে উৎপন্ন ফল ও ফসল। কারণ জমি থেকে যে দিন উৎপন্ন ফল ও ফসল কাটা হয় সেদিন তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿وَءَاتُواْ حَقَّهُۥ يَوۡمَ حَصَادِهِۦۖ ١٤١﴾ [الأنعام: 141]

“আর তার (অর্থাৎ ফল ও ফসলের) হক দিয়ে দাও, যে দিন তা কাটা হয়”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৪১]

অনুরূপ জতুষ্পদ প্রাণীর বাচ্চার যাকাত, অর্থাৎ হিজরী বছরের মধ্যবর্তী যদি কোন পশু বাচ্চা জন্ম দেয়, সেই বাচ্চা নিসাবের সাথে যোগ হবে। সামনে তার আলোচনা আসছে। অনুরূপ ব্যবসায়ী পণ্যের মুনাফা, অর্থাৎ বছরের মাঝখানে অর্জিত মুনাফা মূলধনের সাথে যোগ হবে, যদিও মুনাফার ওপর এক বছর পূর্ণ না হয়। অনুরূপ গুপ্তধন, তার ওপরও হিজরী এক বছর পূর্ণ হওয়া জরুরি নয়, সামনে তার বর্ণনা আসছে। উল্লেখ্য, যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য যেসব সম্পদে হিজরী এক বছর পূর্ণ হওয়া জরুরি নয়, তার বিস্তারিত বর্ণনা নির্দিষ্ট স্থানে আসছে।

(লেখকঃ রামি হানাফী মাহমুদ)

চলবে……

[1] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।

[2] সহীহুল জামে‘, হাদীস নং ৪২৬৫।

[3] আশ-শারহুল মুমতি: (৬/২০২-৩)।

[4] দেখুন: সহীহুল জামে‘: হাদীস নং ৭৪৯৭।

মতামত দিন