ইসলামী শিক্ষা কুরআন

কুরআন শিক্ষকের প্রথম দায়িত্ব কুরআনের প্রতি ভালবাসা তৈরী

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

একজন কুরআন শিক্ষকের বক্তব্য:

“ছোটবেলায় যখন প্রথম কুরআন পড়তে শিখি, কখনও আমি নিজে কুরআন পড়তে চেষ্টা করলে আমাকে নিষেধ করা হত – পাছে কোন ভুল হয়ে যায় এই ভয়ে। সুতরাং শিক্ষকের সামনে পড়তে হবে।

এদিকে বাসায় কুরআন পড়াতে ‘হুজুর’ আসতেন খেলার টাইমে। আবার অনেক সময় তিনিই আমাদের কুরআন পড়া শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতেন, ভুল ধরার সুযোগ কই?

আমি মনে করি কুরআনের শিক্ষকের বাসায় আসার সময়টা কখনোই বিকেলে বা এ রকম খেলা বা আনন্দের সময় হওয়া ঠিক নয়।

মা-বাবা কখনও বলতেন ছেলে কুরআনে হাফিয হলে কতই না ভাল হত! কিন্তু লোকমুখে হিফযখানার যে বিবরণ শুনতাম, তাতে আমার মনে এর প্রতি রীতিমত ভীতিই কাজ করত। আমাকে কোন মাদ্রাসায় পড়তে হবে ভাবলেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠত।”

সন্তানদের কুরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি অনেক সময় আমাদের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায় তা হল: সবচেয়ে আগে কুরআনের প্রতি ভালবাসা জন্ম দেয়া।

জনৈক বাবার বক্তব্য:

“বড় ছেলেটিকে ছোটবেলায় টিভির বিকল্প হিসেবে কুরআন তেলাওয়াতের ভিডিও ছেড়ে দিতাম। কিছুদিনের মাথায় সেও ক্বারী সাহেবদের মত কানে হাত দিয়ে তেলাওয়াত শুরু করল মনের আনন্দে। তার কেরাতের দর্শক হত ‘পটি’তে উপবিষ্ট আমার ছোট ছেলে আর তার কিছু খেলনা খরগোশ। আমরা উৎসাহ দিতে ওদের তেলাওয়াতের এই ‘মাহফিল’ ভিডিও করতাম।”

ঈমান অ্যারাবিক স্কুলের কুরআন ক্লাসে একজন শিক্ষক তার একটি ক্লাসের ছাত্রদেরকে এক বছরে আমপারা মুখস্থ করানোর টার্গেট নিলেন। তিনি তাদের সামনে বিষয়টিকে একটা অবশ্য-করণীয় অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে তুলে না ধরে বললেন:

“আচ্ছা, মা-বাবা আমাদের জন্য অনেক কিছু করেন, তাঁদেরকে আমরা কিছু উপহার দিতে পারি? ছাত্রদের মন্তব্যগুলো শেষ হলে তিনি বললেন: আমরা এ বছর ডিসেম্বরে (অর্থাৎ স্কুলের ছুটির সময়) প্রত্যেকে তার মা-বাবাকে দেয়ার জন্য খুব সুন্দর একটা উপহার রেডি করব ইনশাআল্লাহ। আমরা প্রত্যেকে আমপারা মুখস্থ করে তা স্কুলেই রেকর্ড করব, এরপর বছর শেষে সেই রেকর্ডিং নিজ নিজ মা-বাবাকে উপহার দেব, কেমন হবে? ছাত্ররা নতুন কিছু করার স্বভাবসুলভ উৎসাহের কারণে এতে স্বতস্ফূর্তভাবে সাড়া দিল।”

মোটকথা প্রথম কাজ কুরআনকে ভালবাসা, কুরআন শেখার প্রতি উৎসাহ তৈরী করা। তাহলে বাচ্চারা নিজেদের আগ্রহে প্রত্যেকে নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী কুরআন আয়ত্ত করবে।

এর বিপরীতে শুধুমাত্র চাপ প্রয়োগে কুরআন শেখানোর চেষ্টা করা হলে এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

আমার এক ছাত্র অবসর সময়ে গুনগুন করে কুরআন তেলাওয়াত করে, এতে সে নিজের থেকে কিছু যোগ করে বলে তার বাবা আশংকা প্রকাশ করলেন। আমি বললাম, তাকে শুধু এটুকু নিষেধ করেন: “বাবা, নিজে কিছু বানিও না” কিন্তু তাকে গুনগুন করতে দিন।

আরেকজন বাবার বক্তব্য:

“আমার বাসার সব জায়গায় কুরআন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। তার কারণ, বাচ্চারা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভঙ্গীতে শুয়ে বসে কুরআন হাতে নিয়ে পড়তে থাকে। যদিও কুরআন তেলাওয়াতের কিছু আদব আছে এবং কুরআন পড়া শেষে মুসহাফগুলো গুছিয়ে রাখা উচিৎ, তবুও আমি এ নিয়ে বেশি কড়াকড়ি করি না – তারা যে কুরআন পাঠকে অভ্যাস বানিয়েছে সেটাই বড় কথা। বয়স বাড়লে নিজেরাই কুরআন পাঠের আদবের ব্যাপারে আরও সচেতন হবে ইনশাআল্লাহ!”

আমিও এই বাবার সাথে একমত।

কুরআনের শিক্ষকরা চাইলে বিভিন্নভাবে ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদেরকে কুরআনের প্রতি আগ্রহী করতে পারেন, জন্ম দিতে পারেন কুরআনের প্রতি ভালবাসা। এর বিপরীতে অযোগ্য শিক্ষক কুরআনকে ছাত্রের কাছে করে তুলতে পারে ঘৃণার পাত্র। তাই বাচ্চার শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে।

যদি বাচ্চার মনে কুরআনের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করা যায়, তবে তাদেরকে কুরআন শেখানোর চেয়ে সহজ আর কোন কাজ নেই।

আমি আমার ৯ বছর বয়সী এক ছাত্রকে তেলাওয়াতের ক্লাসের মাঝখানে আমাকে থামিয়ে পাঠ্য সূরার অর্থ সম্পর্কে প্রশ্ন করতে দেখেছি। এই ছাত্র আমাকে খুব সমীহ করলেও কুরআনের প্রতি আগ্রহের কারণে সে আমাকে থামিয়ে প্রশ্ন করতেও দ্বিধান্বিত হয় নি, আলহামদুলিল্লাহ! আর ধন্যবাদ তার মা-বাবাকে।

মা-বাবা ও শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান: কুরআনের প্রতি ভালবাসা তৈরী করুন। বাকী কাজটুকু কুরআনই করবে।

মতামত দিন