জীবনী বিজ্ঞান ও ইসলাম

একজন বিখ্যাত জ্ঞানসাধক আল-বিরুনী

অতীতের মুসলিমদের বৈজ্ঞানিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সৃষ্টিশীল কাজ ও অর্জনগুলো আমাদের বরাবরই বিস্মিত করে। ইসলামের স্বর্ণযুগে, গণিত থেকে শুরু করে চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন, শিল্পকলা, পদার্থবিজ্ঞান ইত্যাদি সকল বিষয়েই মুসলিমদের নতুন নতুন আবিষ্কার, পুরনো জিনিষগুলোকে ঘষেমেজে নতুন রূপ দান করা ইত্যাদি সবকিছুতেই মুসলিমরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানীদের কথা চিন্তা করতে গেলে ইবনে সিনা, ইবন আল-হাইথাম, ইবন খালদুন, আল-ফারাবী ইত্যাদি নামগুলো নিজের অজান্তেই কল্পনায় চলে আসে।
.
সর্বকালের সেরা স্কলারদের এই তালিকার আরেকটি নাম হচ্ছে পারস্যের মুসলিম স্কলার আবু রায়হান আল-বিরুনী। তার জন্ম ৯৭৩ ইংরেজি সনে, মৃত্যু ১০৪৮ ইংরেজি সনে, এবং তিনি জীবনের বেশীরভাগ সময়ই কাটিয়েছেন মধ্য এশিয়া ও ইন্ডিয়াতে। 


.
তার সুপ্রসিদ্ধ কর্মজীবনের বর্ণময় যাত্রায় তিনি ইতিহাস, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ভাষাতত্ত্ব, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, ভূবিদ্যাসহ অনেক বিষয়ে পাণ্ডিত্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। তার সময়ে গোটা মুসলিম বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও তিনি সকল ঝামেলার উর্ধ্বে থেকে তার কাজ চালিয়ে যান এবং ইতিহাসের সর্বকালের সেরা একজন স্কলার হিসেবে গড়ে উঠেন।
.
শৈশবকালঃ
.
আল-বিরুনীর জন্ম ৯৭৩ ইংরেজি সনে উত্তর-পূর্ব পারস্যের খোরাসান প্রদেশে। তার সময়ের অন্যান্য সব শিশুর মতো তিনিও শৈশবেই জ্ঞানার্জন করা শুরু করেন। তখন তিনি আরবী ও ফারসি ভাষা, ইসলামের প্রাথমিক বিষয়সমূহ এবং বিজ্ঞানের উপর জ্ঞানলাভ করেন। শুরু থেকেই তিনি গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ আগ্রহ দেখান এবং পরবর্তীতে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদদের অধীনে পড়ালেখা করে জ্যোতির্বিদ্যায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
.
২০ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ শুরু করেন। ৩ বছর ধরে তিনি গোটা পারস্য চষে বেড়ান এবং বিভিন্ন স্কলারের অধীনে পড়ালেখা করে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। ৯৯৮ ইংরেজি সনে তিনি জুরজান (বর্তমানে ‘গুরগান’, উত্তর ইরানের একটি শহর) এ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং স্থানীয় শাসক শামস আল-মা’আলি কাবুস এর অধীনে চাকুরী নেন। জীবনের পরবর্তী ১০ বছর তিনি উত্তর ইরানের এই ছোট্ট শহরেই বসবাস করেন, নিজের গবেষণা চালিয়ে যান, বই লিখেন, এবং জ্ঞানার্জনে রত থাকেন।
.
এ সময়েই তিনি তার কিংবদন্তী গ্রন্থ রচনা করেন যেখানে তিনি প্রাচীন সভ্যতাসমূহের উত্থান এবং পতনের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। এ রচনার মাধ্যমেই ভবিষ্যতে অনেক বিষয়ে তিনি যে পাণ্ডিত্য অর্জন করবেন তার পূর্বাভাস পাওয়া যায়। গ্রন্থটি শুধুই একটি ইতিহাস গ্রন্থ ছিলনা, বরং ইতিহাসের পাশাপাশি বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের বিস্তারিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে তিনি অতীতের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন। জুরজান শহরে তার করা কাজগুলোর মাধ্যমেই তিনি তৎকালীন বিশ্বের অগ্রগামী মস্তিষ্কের একজন হিসেবে বহিঃপ্রকাশ করেন।
.
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারসমূহ :
.
ইন্ডিয়ার ইতিহাস এবং সংস্কৃতির এক বিশেষজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি আল-বিরুনী বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার জন্যও সময় বের করতে পেরেছিলেন। যেহেতু তিনি অনেক ভ্রমণ করতেন, তাই বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য সরাসরি দেখার এবং নিজ হাতে পরখ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি অনেক নতুন তত্ত্ব প্রদান করেন এবং তত্ত্বগুলো কিভাবে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত তা দেখিয়েছিলেন। তিনি গঙ্গা নদীর উৎস থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত নদীতে বিভিন্ন ধরনের মাটির উপাদান নিয়ে গবেষণা করেন। এর মাধ্যমে কিভাবে মাটির ক্ষয় হয়, কিভাবে নতুন করে চর জেগে উঠে ও আকৃতি পায় তা নিয়ে তত্ত্ব প্রদান করেন, এবং এসব ক্ষেত্রে পানি কি ভূমিকা পালন করে তার উপর বিশেষভাবে আলোকপাত করেন।
.
একই ধরনের আরেক গবেষণায় তিনি হিমালয় পর্বতমালায় প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম আবিষ্কার করেন, যে পর্বতমালার মাধ্যমে ইন্ডিয়া গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। সমুদ্রের নিম্নস্তরের প্রাণী শামুক এবং এ জাতীয় অন্যান্য প্রাণী সমুদ্র থেকে স্থলভাগের দিকে হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করে হিমালয় পর্বতমালার পাশে চলে আসবে, ব্যাপারটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। এর মাধ্যমে আল-বিরুনী এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে হিমালয় পর্বতমালা অবশ্যই পূর্বে কোন এক সময় সমুদ্রের নীচে ছিল, এবং ধীরে ধীরে লক্ষাধিক বছর পর বর্তমান অবস্থানে সরে এসেছে। পৃথিবীর গঠনের ব্যাপারে আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণা অনুযায়ী পৃথিবীর উপরিতল কিছু পাতলা, অনমনীয় পাতের সমন্বয়ে তৈরি, যারা একে অপরের দিকে চলাচল করতে সক্ষম। এই পাতগুলো টেকটনিক পাত হিসেবে পরিচিত। আল-বিরুনীর গবেষণাটি আধুনিক বিজ্ঞানের এই ধারণাকেই নিশ্চিত করেছিল – কিভাবে সময়ের সাথে মহাদেশগুলোর স্থান পরিবর্তন হয়।
.
আল-বিরুনী ভূবিদ্যা (Geology)-র একজন পথিকৃৎ। তিনি শতাধিক বিভিন্ন ধরনের ধাতু এবং রত্নপাথর সংগ্রহ করে সেগুলো পরীক্ষা করেন। এগুলোর বৈশিষ্ট্য, এগুলো কিভাবে সৃষ্টি হয়, এবং কোথায় পাওয়া যায় তার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। রত্নপাথর নিয়ে লেখা তার বইগুলো স্ট্যান্ডার্ড বই হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।
.
একাদশ শতাব্দীতে আল-বিরুনী তার বর্ণময় কর্ম এবং গবেষণা জীবন চালিয়ে যান, এবং বিভিন্ন বিষয়ের গবেষণায় নতুন নতুন ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রদান করেনঃ
.
# কিভাবে পৃথিবীর এর কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান।
# কিভাবে কুয়া এবং ঝর্ণা থেকে পানি ভূ-পৃষ্ঠে প্রবাহিত হয়।
# স্থিতিবিদ্যা (Statics) এবং গতিবিদ্যা (Dynamics) কে একীভূত করে বলবিদ্যা (Mechanics) নামক গবেষণার নতুন ক্ষেত্রের প্রবর্তন। (Mechanics এর উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক Mechanical Engineering, Civil Engineering, Structural Engineering, Aerospace Engineering, Automotive Engineering, Naval Architecture, Astronomy, Geophysical Science, Biophysics সহ গবেষণা ও কাজের হরেক রকমের ক্ষেত্র)।
.
# সহস্রাধিক শহরের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ নির্ণয়, এবং এর সাহায্যে তিনি প্রত্যেক শহর থেকে মক্কার দিক নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
. 
# ‘ছায়া’-র অপটিক্যাল (আলোকবিদ্যা বিষয়ক) গবেষণা, এবং এর মাধ্যমে নামাজের সময় নির্ধারণ করেন।
. 
# মানুষের মাঝে জোতির্বিদ্যা (Astronomy)-র ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ ধ্যান-ধারণা দূর করে এর বৈজ্ঞানিক রূপ দেন।
.
৭৫ বছরের বর্ণময় জীবনে আল-বিরুনী প্রচলিত অসংখ্য বিষয়ে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন। ১০৪৮ ইংরেজি সনে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি একশ’রও বেশী বই লিখেন যার বেশীরভাগই পরবর্তীতে হারিয়ে গিয়েছে। তার ধীশক্তি, বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে একসূত্রে গেঁথে দেয়ার দক্ষতা তাকে স্থান করে দিয়েছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুসলিম স্কলারদের তালিকায়। 
.
তার জীবন প্রমাণ করে জ্ঞানের জগতের প্রচলিত সীমানাকে নবদূরত্বে নিয়ে গিয়ে নতুন নতুন সব শাখা সৃষ্টি করায় অতীতের মুসলিম স্কলারদের যোগ্যতা কতটুকু ছিল। তার অর্জনগুলো দেখিয়ে দেয় কিভাবে সেরা স্কলারগণ রাজনৈতিক সমস্যা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, এবং জীবনের অন্যান্য সাধারণ সব সমস্যার উর্ধ্বে থেকেও ধরণীকে পরিবর্তন করে দেয়ার মতো গবেষণা করতে পারেন এবং অসাধারণ সব আবিষ্কার করে যান মানব সভ্যতার কল্যাণ সাধনের জন্য।
.
কাশেম বিন হুসাইন
. 
শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০১৫
(বিডিলাইভ২৪)

মতামত দিন