ইসলামের ইতিহাস

আফ্রিকায় ইসলাম ও মুসলমান

এসএস লিডার নামে এক পশ্চিমী লেখক লিখেছেন, ‘‘যখন (সপ্তম শতাব্দীতে) আরব বিজেতারা তাদের সবচেয়ে যোগ্য মানুষদের পাঠালেন মিসরের রাজধানীতে খৃস্টান আর্চবিশপ সাইরাসের কাছে মিসরের আত্মসমর্পণের ব্যাপারে শর্তাবলী ঠিক করতে। তখন আর্চবিশপ চেঁচিয়ে বললেন, ‘কালো মানুষটাকে হটাও, আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই না।’
নিগ্রো উবায়দা ছিলেন সেই সবচাইতে যোগ্য মানুষগুলোর দলনেতা। খৃস্টান পাদ্রী আর্চবিশপকে অবাক করে বলা হল যে, ঐ কালো মানুষটাকে মুসলমান সেনাপতি পাঠিয়েছেন, আর মুসলমানরা নিগ্রো ও সাদা মানুষকে সমান মর্যাদায় দেখে, তাদের গায়ের রঙ নয়, তাদের চরিত্রের গুণ দিয়ে বিচার করে। পাদ্রী বললেন, ‘ঠিক আছে, যদি নিগ্রোই নেতৃত্ব দেয়, তাহলে সে যেন অবশ্যই নরমভাবে কথা বলে, যাতে আমার সাদা কর্মকর্তাগণকে ভীত না করা হয়।’
.
নিগ্রো মুসলমান নেতা বললেন, ‘‘আমার সাথীদের ভিতর হাজার জন কালো রয়েছে, আমার মতই কালো। আমি ও তারা শত শত শত্রুকে একসঙ্গে যুদ্ধে মোকাবিলা করতে তৈরি। আমরা শুধু স্রষ্টার জন্য লড়াই করি। আর তাঁর ইচ্ছা অনুসরণ করি। শুধু আমাদের ক্ষুধা ও কাপড়ের ব্যবস্থা হলে আমরা ধন-সম্পদের পরোয়া করি না। এই দুনিয়া আমাদের জন্য কিছু নয়। পরকালই সবকিছু।’’
.
কৃষ্ণাঙ্গ সেনানায়কের এই মর্যাদা ইসলামের আফ্রিকার মর্যাদাকে বৃদ্ধি করেছে। এটা সে যুগে বিরল।’’ পশ্চিমী লেখক আরও লেখেন, ‘‘প্রত্যেক নিরপেক্ষ সমীক্ষক দেখেছেন যে, এই ধরনের শ্রেণী বৈষম্যহীনতা নিশ্চয়ই খৃস্টান মিশনারিদের ধর্মপ্রচারের সবচেয়ে বড় বাধা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই নিচু ও কৃষ্ণাঙ্গদের নিকট মুসলমানদের মনোভাবের বিরুদ্ধে অন্য কোন খৃস্টীয় প্রচারণা দাঁড়াতে পারে না। মুসলমান বলে, ইসলাম গ্রহণ কর। সঙ্গে সঙ্গে তোমরা সমান হয়ে যাবে আর ভাই।’ ইসলামে কোন বর্ণবাদ নেই।’’ (এস এস লিডার, ‘‘ভেইলড মিস্টরিস অব্ ইজিপ্ট, ১৯১২, পৃষ্ঠা ৩৩২-৩৩৫)
.
আর এক পশ্চিমা লেখক লটন ল্যানসেলট মন্তব্য করেন, ‘‘এটা অবশ্যই মানতে হবে, ধর্ম হিসাবে মুহাম্মাদের ধর্ম খৃস্টানধর্মের চেয়ে বেশি মানানসই আফ্রিকার জন্য। আসলে আমি বলতে চাই যে সমগ্র বিশ্বের জন্যই ইসলাম বেশি মানানসই।’’ (লটন ল্যানসেলট, ‘‘দি স্পেয়ার’’ লন্ডন, ১২মে ১৯২৮)।
.
আসলে ইসলাম আফ্রিকার কালো মানুষকে তার প্রকৃত মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছে। কোন ধর্মে হযরত বেলালের মতো কোনো কৃষ্ণাঙ্গ এত মর্যাদা পান নাই, যা তিনি পেয়েছেন নবী (সা.) এর ঘনিষ্ঠ সাথী হিসেবে।
.
সি স্নুক হুরগ্রনজি নামক এক পশ্চিমী লেখক মন্তব্য করেছেন, ‘‘ইসলামের নবী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক একতা ও মানবীয় ভ্রাতৃত্বের নীতিকে এমন বিশ্বব্যাপী ভিত্তি প্রদান করেছে যা অন্যান্য জাতিকে আলোকবর্তিকা প্রদর্শন করেছে। আজ কালো খৃস্টানরা খৃস্টানদের গির্জায় ঢুকতে পারে না। একজন নিগ্রো মেয়েকে বিয়ে করাতে এক খৃস্টান ধর্মপ্রচারককে বয়কট করা হয়। মুসলমানরা আরো বহু কিছু বিষয় খৃস্টানদের সম্পর্কে নির্দেশ করছে, যা খৃস্টান সমাজের নিচু মান প্রদর্শন করে। আসল কথা হচ্ছে জাতিসংঘের ধারণার বাস্তবায়নে ইসলাম যা করেছে আর কোনো জাতি তার সমপরিমাণ কিছু দেখাতে পারে না।’’ (মোহাম্মদানিজম, ১৯১৬)।
.
লালা হর দয়াল লিখেছেন,

‘‘অন্যসব ধর্ম বিধানের চেয়ে ইসলামে বর্ণবিভেদ মিটাতে বেশি সফলকাম হয়েছে। আফ্রিকার মুসলমান নিগ্রোর বা ইন্ডিয়ান মুসলমান চামার (মুচি)দের তাদের মুসলমান সাথীরা অস্পৃশ্য মনে করে না। কিন্তু খৃস্টান নিগ্রো বা হিন্দু চামারদের ইউরোপীয় খৃস্টান ও উচ্চবর্ণের হিন্দুরা প্লেগের মতো মনে করে এড়িয়ে চলে।’’

(১৯৪৬ সালে লাহোর থেকে প্রকাশিত মোহাম্মদ আমীনের ‘‘উইসডম অব প্রফেট মোহাম্মদ’’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ৯৫)।
.
জন উইলিয়াম ড্রেপার মন্তব্য করেন,

‘‘এটা একটা ভুল ধারণা যে আরবদের উন্নতি শুধু তলোয়ার দিয়ে হয়। তলোয়ার একটা স্বীকৃত মতকে পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু এটা মানুষের মনকে পরিবর্তিত করতে পারে না।

… যখন (খৃস্টানের ভিতর) বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভিতর ঝগড়া-বিবাদ ও সংখ্যাবিহীন অরাজকতা চলছিল তখন একটি শক্তিশালী আওয়াজ উঠল সমগ্র দুনিয়ায়- প্রভু শুধু একজন- তখন যেসব দলাদলি বন্ধ হয়ে গেল তা কি অবাক করা বিষয়? এটা কি অবাক করা যে সমগ্র এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে খৃস্টবাদ বিদায় নিল ও সবাই ইসলাম গ্রহণ কর?’’ (হিসটরি অব দি ইনটেলেকচুয়াল ডেভেলপমেন্ট অব ইউরোপ, খন্ড ১, লন্ডন, ১৮৭৫ পৃষ্ঠা ৩৩২-৩৩৩)।
.
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জন এল এসপসিটো লিখেছেন, ‘‘আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে ইসলাম মূলত ইসলামের সেনাবাহিনীর দ্বারা নয়, ভ্রাতৃসংঘ ও সওদাগরদের মাধ্যমে প্রচারিত হয়। (দি ইসলামিক থ্রেট, পৃষ্ঠা ৩৭)
.
স্যার উইলিয়াম মুইর লেখেন, ‘‘এ ব্যাপারে কোন প্রশ্ন নেই যে ইসলাম খাঁটি একত্ববাদ এবং ইনসাফ ও মানবতার ওপর ভিত্তি করে যে মূল বিধান দিয়েছে তা দিয়ে যেসব নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী মূর্তিপূজা এবং ভূতপ্রেত পিশাচ পূজায় লিপ্ত, যেমন মধ্য আফ্রিকার জনগোষ্ঠীসমূহ, তাদেরকে উপরের দিকে টেনে তোলে। আর কোনো কোনো দিকে বিশেষ করে ব্যবহার চাল চলনের বিষয়ে এইসব জনগোষ্ঠীর নৈতিকতার বাস্তব উন্নতি করেছে।’’ (‘‘মোহামেট ইন ইসলাম’’, লন্ডন, ১৮৯৫, পৃষ্ঠা ২৪৬)।
.
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এ জে টয়েনবি মন্তব্য করেছেন, ‘‘যদি কখনও এই এলাকাগুলোতে (মধ্য আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়াতে) এখানকার স্থানীয় জনসাধারণ আধ্যাত্মিকতা দিয়ে নিজেদের পূরণ করতে সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে ইসলামী আদর্শই তাদের আধ্যাত্মিক শূন্যতাকে পূরণ করেছে।’’ (সিভিলাইজেশন অন ট্রায়াল, নিউ ইয়র্ক, ১৯৪৮, পৃষ্ঠা ২০৭-২০৮)।
.
আফ্রিকার প্রতিটি রাষ্ট্রে ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে বিস্তারিত লেখার সুযোগ খুবই কম। এখানে আমরা শুধু সামান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরব।
.
প্রখ্যাত ইসলাম ধর্ম প্রচারক আহমদ দিদাতের এক বক্তৃতা থেকে জানা গেল (‘পিস’ টিভিতে ১৯ মার্চ ২০১০ প্রচারিত) যে নিকা ও অন্যান্য কৃষ্ণ সম্প্রদায় আসলেই ‘‘ইসলামপন্থী’ উপজাতি ছিল। মিশনারিরা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা নিরাকার স্রষ্টার উপাসনা করত। তারা কোন মূর্তিপূঁজা করত না। খৃস্টানরা মিশনারিরা তাদেরকে প্রথম যীশুর মূর্তিপূঁজা শেখায়।
.
আলজিয়ার্সকে কেন্দ্র করে আলজিয়ার্সের আর্চ বিশপ কার্ডিনাল লেভিজেরি ‘‘হোয়াইট ফাদারস’’ নামে খৃস্টান মিশন চালিয়ে কৃষ্ণ আফ্রিকীয়দের খৃস্টান বানাতেন। তিনি ছিলেন ফরাসি শ্বেতাঙ্গ। এই মিশনারিরা আরবদের দাস ব্যবসায়ী বলে নিগ্রোদের ভয় দেখালে লেভিজেরি কৃষ্ণ শিশুদের কিনে এনে খৃস্টান বানাতেন। লেভিজেরি উত্তর আফ্রিকায় রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান ও পোপের প্রতিনিধি ছিলেন। লেভিজেরি চাইতেন পোপ আরবদের তথাকথিত দাস ব্যবসায়ের নামে আরবদের দমন করুক, আর এ ব্যাপারে সব খৃস্টান রাষ্ট্র একজোট হোক আর পোপ নেতৃত্ব দিক।
.
লেভিজারি একবার ১৮০০ শিশুকে, যারা আলজিয়ার্সের ছিল (নিশ্চয়ই মুসলমান শিশু) নিজের তত্ত্বাবধানে এনে খৃস্টান রূপে বড় করেন দুর্ভিক্ষের দোহাই দিয়ে। পোপের এই কর্মকর্তা অন্যান্য মিশনারী গোষ্ঠীকেও তার তরিকা অনুসরণ করতে বললেন। গরিব মানুষ, বিশেষ করে বাচ্চাদের কিনে এনে খৃস্টান বানাও আর কি। এই বাচ্চারাই ভবিষ্যতের খৃস্টানদের নিউক্লিয়াস (কেন্দ্র) হবে।
.
রোমান ক্যাথলিক মিশনারিরা চুটিয়ে এই নীতি প্রয়োগ করতে থাকল। কঙ্গোতে ভালোভাবে প্রয়োগ করা হলো এই শিশু চুরি নীতি। পরিত্যক্ত শিশুর দোহাই দিয়ে এই শিশু দাস বৃত্তি বা শিশু চুরি করতে থাকল। এমনকি ইটালিয় অন্যান্য খৃস্টান মিশনগুলো শিশুদের কিনে কিনে খৃস্ট পল্লী বাড়াতে থাকল। স্টিফেন নেইল লিখেন, একবার ত্রিশটা শিশু তিনশো দশ পাউন্ডে খরিদকরা হয় (পৃষ্ঠা ৪২৮, ফুটনোট)।
.
জেজুইট খৃস্টান মিশনারিরাও এই দাস বা শিশু ক্রয়ে নেমে পড়ে ভালভাবে। নেইল আরো লিখেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বাসুটোল্যান্ড যখন জটিল আশ্রিত রাজ্য হলো তখন সে রাজ্য রোমান ক্যাথলিক মিশনারিদের প্রধান কিল্লায় পরিণত হল। সেখানে তাদের মিশনারিদের মানুষ, মেয়ে মানুষ ও অর্থ বানের মতো আসতে লাগল। (পৃষ্ঠা ৪৩৩) পর্তুগাল দখল করেছিল এ্যাংগোলা ও মোজাম্বিক (যে নামটাই মুসলমান মুসা বিন… থেকে)। যেখানে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত শিক্ষা ছিল গির্জার নিয়ন্ত্রণে। নেইল সরাসরি বলেন, ‘‘সেখানে সরকারের সমর্থন খৃস্টধর্মে দীক্ষা সহজ করে’’ (পৃষ্ঠা ৪৩৪)।
.
আলজেরিয়া : লোকসংখ্যা ২ কোটি ৬১ লাখ। শতকরা ৯২ জন আরবি ভাষী মুসলমান। ১৮৩০ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের দখলে ছিল দেশটি। ১৯৪৫ সালে ৪৫,০০০ ও পরবর্তীতে দশ লাখ মানুষ নিহত হয় ফরাসীদের হাতে। স্বাধীনতার পর নেতারা সমাজতন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। সমাজতন্ত্র হলো ব্যর্থ। মার্ক্সের দর্শন জনগণ গ্রহণ করল না। ঠেলাঠেলি চলল বেশ। এখন আবার ধার্মিক মুসলমানদের ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে নেতারা পাশ্চাত্যের নীতিতে চলে গেছেন। আলজেরিয়াতে গৃহযুদ্ধ লাগিয়েছে খ্রিস্টান জগত।
.
ইথিওপিয়া : ১২ লাখ ২১ হাজার ৯০৫ বর্গ কিলোমিটারের দেশ। লোকসংখ্যা ৩ কোটি ৩৯ লাখ (১৯৭৫) । চল্লিশ শতাংশ মুসলমান, চল্লিশ শতাংশ খ্রিস্টান এবং বাকিরা প্রকৃতিপূজক। খ্রিস্টানরা প্রশাসনের চাবিকাঠিতে। সমাজতন্ত্র করতে গিয়ে মুসলমানরা বড় শিকার। তবে ক্রুসেডের আমল থেকে খ্রিস্টানরা মুসলমানদের উপর অত্যাচার চালায়। উনিশ শতকের নবম দশকে রাজা জোহানেস মুসলমানদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। প্রায় পঞ্চাশ হাজার মুসলমানদের জোর করে খ্রিস্টান বানানো হয়।
.
উপনিবেশবাদের আমলে ইউরোপীয় খ্রিস্টান শক্তিগুলো ইথিওপিয়ার খ্রিস্টান শাসকদের সঙ্গে মিলে মুসলমানদের উপর অত্যাচার চালায়। ইথিওপিয়ার খ্রিস্টান শাসক জোহানসের মৃত্যুর পর রাজা দ্বিতীয় মেনেলিক ১৮৮৯-এর দিকে মুসলিম প্রধান প্রতিবেশী রাজ্যগুলো যেমন ওগাডেন, হারার, আউসা, আরুমি, জিসনা, ওরালে প্রভৃতি ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের সাহায্যে দখল করলেন এবং মেনেলিক মুসলিম নির্যাতন শুরু করে দিলেন। মাদরাসা ও অন্যান্য মুসলিম শিক্ষা কেন্দ্র বন্ধ করে দিলেন। মসজিদ ভেঙ্গে দিলেন। আলেম ও মুসলিম বিদ্বানদের জেলে ভরতে লাগলেন।
.
মেনেলিকের পরবর্তী সম্রাট মুসলমানদের প্রতি কিছুটা সহনশীল হয়েছিলেন। তখন পোপের ষড়যন্ত্রে সম্রাট লীজ ইস্যুকে উৎখাত করল সেনাবাহিনী, যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রে অনেক দেশে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। মৃত সম্রাট মেনেলিকের মেয়ে সাদিতুকে করা হলো সম্রাজ্ঞী । মুসলমানদের উপর পাইকারী জুলুম চলল আবার। পরবর্তী সম্রাট হাইলে সেলাসী রাজ্য থেকে মুসলমান কর্মচারী সরালেন। হারার নিসমা, ইকাত প্রভৃতি শহর থেকে ইসলামীকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিলেন। শরিয়ত আদালত বন্ধ হল। মুসলমানদের উপর নৈতিক কর আরোপ করলেন সম্রাট।
.
পরবর্তীতে খ্রিস্টান সামরিক নেতারা ক্ষমতায় এলেন। রাজধানী আদ্দিস আবাবাতে নিউ মার্কেট এলাকায় হাইলে মরিয়ম সরকার মসজিদে ঢুকে গুলি করে বিশ মুসল্লীকে নিহত ও বহুজনকে আহত করলো ইমামের দু’ছেলেকে হত্যা করল। রাস্তায় রাস্তায় মুসলমানদের লাশ পড়ে থাকতে লাগল। ১৯৮৫ সালে ইরিত্রিয়া, টাইগ্রেওরেসিয়া, ওগাদেন, হারারজি, গারা মালটা, চারদর, ওরজাম আনিয়া নামক স্থানে হাজার হাজার মুসলমান হত্যার শিকার হল।
.
আনিয়া শহরের প্রখ্যাত আলেম শেখ হাসান আদম এবং শেখ ইউসুফ আলীকে হত্যা করা হল। সেই বছরই জানুয়ারিতে তারগা শহরে ষাট জন মুসলমানকে হত্যা করা হল। মেছগিষ্ঠু সরকার বাবলি, বিফতু ও শারীক খালিদ শহরে একশ সাতচল্লিশ জন মুসলমানকে হত্যা করল। ১৮৮৫-এর ফেব্রুয়ারিতে কুরকাতে পনর জন এবং ওয়াটারে চল্লিশজন মুসলমানকে হত্যা করা হল। যখনই ইথিওপিয়ায় দুর্ভিক্ষ হয়, খ্রিস্টান সরকার মুসলমান এলাকায় বিদেশী ত্রাণ পাঠায় না ফলে হাজার হাজার মুসলিম মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ১৯৮৪ সালে তাই হয়। এমনকি পরবর্তীতেও তাই।
.
প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী মুহাম্মাদ কুতুব তাঁর ‘‘ভ্রান্তির বেড়াজালে ইসলাম (‘ইসলাম দি মিসআন্ডারস্টুড রিলিজিয়ন’) গ্রন্থে লেখেন, ‘মুসলিম নির্যাতনের আরেকটি উদাহরণ আবিসিনিয়া। ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সূত্রে মিসরের সাথে আবিসিনিয়ার গভীর সম্পর্ক। আবিসিনিয়ার জনসংখ্যার ৩৫%-৪০% মুসলমান বাকী খ্রিস্টান। তবুও সেখানকার খ্রিস্টান শাসনাধীনে এমন একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই যেখানে ইসলমধর্ম বা আরবি ভাষা শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। মুসলমানেরা যদি নিজেদের অর্থ ব্যয়ে প্রাইভেট শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করে তাহলে তার ওপর অতি উচ্চহারে কর ও অন্যান্য অসুবিধার বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে প্রায়ই এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।’ (পৃষ্ঠা১৪৮)
.
মুহাম্মাদ কুতুব আরও লেখেন যে, সরকারের নাকের ডগায় খ্রিস্টান মহাজনগণ মুসলমান খাতকদের দেনার দায়ে আটকে ক্রীতদাসের মতো বিক্রয় করতো এই সেদিনও ইথিওপিয়ায়। বলা হচ্ছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ নাইজেরিয়া সংখ্যালঘিষ্ট হয়ে পড়েছে। এটি একটি রহস্য। ১৯৬৬ সালে জানুয়ারিতে সামরিক অভ্যূত্থানে নাইজেরিয়া প্রথম প্রধানমন্ত্রী হাজী আবু বকর তাফাওয়া ও অন্দ রাজ্যের দু’জন প্রাদেশিক মুখ্য উজির নিহত হন। এটা ছিল একটা ষড়যন্ত্র মুসলমানদের দুর্বল করার। দেশটি ১৯৮৬ সালে ওআইসিতে ঢুকে আবার তা থেকে সরে পড়ে।
.
আহমদ দিদাত বলেন যে, খ্রিস্টানরা আসার আগে নাইজেরিয়ার জনগণ কোনো মূর্তি পূজা করত না। এখন সেখানকার খ্রিস্টানরা যীশুর মূর্তি পূজা করছে। অথচ খ্রিস্টানরা আসার পূর্বে নাইজেরিয়ার জনগণ সূরা ইখলাসের শিক্ষার মতো এক খোদার কথা বলত। প্রেসিডেন্ট উমারুর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট খ্রিস্টান গুডলাক জোনাথন মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে ক্ষমতা কবজায় নেন। সামনে আরও অঘটনের আশঙ্কা।
.
স্টিফেন নেইল লেখেন, ‘ইসলাম একটা শক্তি, আর এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে এটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও ইসলামের কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত মিশনারি সমাজ নেই, তবে এটা বড় ধরনের অনুপ্রবেশের ক্ষমতা দেখিয়েছে এবং দেখাচ্ছে। কারণ এটা নিজেকে আফ্রিকিয় ধর্ম হিসাবে পেশ করছে।
.
মনে হয়, সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে আধা জনসংখ্যা এখনও ‘প্যাগান’ (প্রকৃতি পূজারি) । তবুও শেষ পর্যন্ত, ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চেস প্রতিটি উপজাতির ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে জরিপ শুরু করেছে, যার ফলাফল খ্রিস্টিয় স্বার্থের জন্য অনেক মূল্যবান হবে। (পৃষ্ঠা ৪৯৪-৪৯৫)। জরিপ তো এর ভিতরেই শেষ হয়েছে। তাই কি সুদান ভাঙছে? নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, সোমালিয়ায় প্রভৃতি দেশে গৃহযুদ্ধ? মুসলমানরা বিবাদে লিপ্ত, খ্রিস্টান মিশনারি কাজ সমানে চলছে।
.
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এলপসিটো লেখেন যে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট হাবিব বরগুইবা (১৯৫৬-১৯৮৭) ত্রিশ বছর শাসন করেন ফরাসি সংস্কৃতিকে ধারণ করে। তিনি ১৯৫৭ সালেই ‘পারসনাল স্টেটাস ল’ পাস করে বহু বিবাহ নিষিদ্ধ করেন। এছাড়া তিনি শরিয়া আদালত উঠিয়ে দেন, হিজাব নিষিদ্ধ করেন, রোজাকে নিরুৎসাহিত করেন। উৎপাদন হ্রাসের কারণ দেখিয়ে। তিনি রোজার দিনে কমলালেবু রস প্রকাশ্যে পান করে টিভিতে প্রচার করতেন। এলপসিটো লেখেন হাবিব বরগুইবার নিকট ইসলাম অতীতের জিনিস, আর তিউনিসিয়ার একমাত্র আশা হলো পাশ্চাত্য। (ইসলামিক থ্রেট, পৃষ্ঠা ১৫৩)।
.
উল্লেখ্য যে বরগুইবার স্ত্রী ছিলেন ফরাসী শ্বেতাঙ্গিনী। এই ধরনের নেতার জনগণের সঙ্গে কমই সম্পর্ক থাকে। আফ্রিকার দূরদৃষ্টিহীন মুসলমান নেতারা মুসলমান জনগণের চিন্তাচেতনা থেকে দূরে থাকেন। আর তার পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে পশ্চিমা খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলো, এমন কি ইসরাইলি ইহুদিরাও। খ্রিস্টান রাষ্ট্র ও শাসকরা যেখানে রাজনৈতিক, পররাষ্ট্রনৈতিক কারণে আফ্রিকার খ্রিস্ট ধর্মকে ব্যবহার করছে, সেখানে মুসলমান নেতার খ্রিস্টান নেতাদের চেয়েও বেশি সেকুলার সাজার চেষ্টা করছেন। ফলে তারা আত্মহত্যাই করছেন ব্যক্তিগতভাবে- জাতিগতভাবেও।
.

মতামত দিন