তাবলীগ

দ্বীনের জন্য (?) যখন ফেসবুক…

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আমি অনেকদিন থেকেই খেয়াল করছি আমরা যারা দ্বীনের জ্ঞান অর্জন অথবা একটিখানি সতর্কতামূলক পোস্ট পড়ে নিজের ঈমানটাকে শক্ত করে নেয়া অথবা দাওয়াহ, এরকম কিছু উদ্দেশ্য নিয়ে ফেসবুক ব্যবহার করি তাদের জন্যও সম্ভবত ফেসবুক একটা ফিতনা। উপকারের চেয়ে ক্ষতি এখানে অনেক বেশি। জানি না সবার ক্ষেত্রেই এমন কিনা, কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই আমার মত হওয়াটা অস্বাভাবিক না।

ফেসবুকে দ্বীনি ইসলামিক পেইজ বা ভাই-বোনদের ফলো করা শুরু করেছিলাম প্রায় বছর দুয়েক আগে থেকে। আজকে যখন নিজেকে প্রশ্ন করি, এই দু’ বছরে ফেসবুক থেকে আমার অর্জন কী কী, তাঁর উত্তর সম্ভবত আলহামদুলিল্লাহ অনেক ব্যপারে ভুল ধারনা ছিল, সেগুলো কেটেছে, জীবনঘনিষ্ট অনেক হাদীস, কুরয়ানের আয়াত পড়তে পড়তে মাথায় গেথে গেছে,  অনেক অনেক দ্বীনি বোনের সাথে পরিচয় হয়েছে। অনেক দ্বীনি বোনের প্র্যাক্টিস দেখে নিজেকে এগিয়ে নেয়ার উতসাহ পেয়েছি। কিন্তু কী কী হতে পারত?

এই প্রশ্ন সামনে আসলে আগের প্রাপ্তিগুলো ম্লান হয়ে যেতে চায়। ফেসবুকে গড়ে মোটামুটি দুই আড়াইঘন্টা দিনে ব্যয় হতো আমার। যতবারই ভাবতাম এইতো ঢুকব আর বের হব, পাঁচ মিনিট লাগবে কিন্তু বাস্তবতা ছিল সবগুলো নোটিফিকেশনে চোখ বুলাতেই অন্তত দশ মিনিট চলে যেত। দুই আড়াইঘন্টা নিউজফিডে বিচরণের পরও ঘড়ির দিকে না তাকালে নিজের কাছে মনে হতো বুঝি মাত্র পনেরো মিনিট পার হয়েছে।

আগে ফেসবুক চালাতাম শুধু ল্যাপটপ থেকে। এন্ড্রয়েড ফোন যখন থেকে ইউজ করি তখন দেখলাম এই পাঁচ মিনিটের ধোঁকা আমাকে দিনে অন্তত বিশবার পেয়ে বসে এবং প্রতিবারই বিশ পঁচিশ মিনিট সময় কেড়ে নেয়। যেই কাজই করি না কেন, এমনকি পড়তে বসলেও ফেসবুক সাথে সাথে চলতে থাকে। সব কাজে মনোযোগ কমে অর্ধেক হয়ে যায়।গত দুই বছর যদি আমি দিনে এই দুই আড়াই ঘন্টা নিয়মিত কুরয়ান পড়তাম, কোন তাফসীর গ্রন্থ পড়তাম এতদিনে আল্লাহ চাইলে আমার পুরো কুরয়ান সম্বন্ধে বেশ ভালো একটা ধারণা হতে পারত।

সারাদিন রাত এরকম ফেসবুকে বসে না থেকে এর ভগ্নাংশও যদি কুরয়ানে দিতাম আল্লাহ চাইলে হয়তো এই দুই বছরে হিফয করে ফেলতে পারতাম। যেদিন দুই তিন ঘন্টা টানা ফেসবুকে বসে থেকেছি, ঐ সময়ে একটা দুই তিন পৃষ্ঠার সুরাহ মুখস্ত করে ফেলা যেত আল্লাহ চাইলে। ঈমান বৃদ্ধি করা? এটাও এখন শয়তানের ধোকাই মনে হয়।

ঈমান বৃদ্ধির সবচেয়ে ভালো উপায় কুরআন, কারো কারো ক্ষেত্রে সালাতে দাঁড়িয়ে থাকা, খুব ভালো করেই জানি আমরা। তারপরেও ফেসবুকে বসে থাকি, সালাতে দাঁড়িয়ে থাকি না। এটাকে ওয়াসওয়াসা না বললে আর কী বলব? আর দ্বীনি বোনদের সাথে পরিচয়? আল্লাহ এটা ফেসবুক না থাকলে অন্যভাবে হলেও করাতেন। ফেসবুকের কল্যানে প্রতিদিন একগাদা রান্নার ছবি দেখি, আমি রান্না ভালো  পারি না। শয়তান আমাকে রান্না শিখে নিজের রান্নার ছবিও আপলোড করতে বলে। যেখানে দিনে কতটুকু কুরয়ান পড়ছি নিজেকে সেই প্রশ্ন করলে মাথা নিচু হয়ে যায়। অনেক রংবেরঙ্গের আবায়ার ছবি যখন দেখি শয়তান আমাকে বলে, ‘দেখ সিম্পলের মধ্যেও কত ভালো আবায়া পাওয়া যায়, তোমারও আসলে একটা আবায়া দরকার।’ অথচ ছবিটা দেখার আগে আমার আবায়ার চাহিদা ছিল না।

হাজার হাজার ইসলামিক পোস্ট পড়েছি। দিনশেষে সেগুলো থেকে কয়টা হাদীস আমি মুখস্ত বলতে পারব রেফারেন্স সহ? একটা উপকারী পোস্টের সাথে সাথে কয়টা অহেতুক পোস্টের পেছনে আমার সময় গেছে? কত অহেতুক আড্ডা হয়েছে, যেগুলোর জন্য ইন শা আল্লাহ যদি জান্নাতে যাইও তারপরেও আফসোস ছাড়া ঐ দ্বীনি বোনের সাথে বসে আর কিছু করব না? অনেকবার ভেবেছি ফেসবুক ছেড়ে দেব। পেরে উঠিনি।

ইন শা আল্লাহ এই রামাদানে ফেসবুক ইউজ খুব কমিয়ে ফেলার ইচ্ছা আছে। ইন শা আল্লাহ ফেসবুকে না বসার অভ্যাস একটা পজিটিভ ফিডব্যাকের মত কাজ করে। দুইদিন গ্যাপ দেয়ার পর তৃতীয় দিন ঢুকলে একগাদা নোটিফিকেশন জমে থাকে। সব দেখার ধৈর্য আমার থাকে না। সেদিন যদি তেমন কোন এক্টিভিটি ছাড়াই বের হয়ে আসি, আস্তে আস্তে নোটিফিকেশন কমতে থাকবে, একসময় ইন শা আল্লাহ দেখা যাবে নিউজফিডে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া ফেসবুকে করার তেমন কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। এই আসক্তিটুকু নিয়ন্ত্রনে আনতেই হবে ইন শা আল্লাহ।

সপ্তাহে একবার ফেসবুকে বসলেই ইন শা আল্লাহ এমনটা সম্ভব।আর দাওয়াহ? রিয়ার আশংকা যদি বাদও দিই, লাইক গোনার নেশা যদি নাও ধরি, তারপরেও ফেসবুকের দাওয়াহর থেকে সামনাসামনি দাওয়াহ অনেক এফেক্টিভ। ফেসবুকের মানুষকে দাওয়াহ করার মানুষের তো অভাব নেই। কিন্তু পাশের বাসার যে আন্টির জীবন মানেই জী বাংলা উনাকে কে বুঝাবে? আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ করা, তাঁদের দাওয়াহ দেয়া ফেসবুকের হাজার হাজার মানুষকে দাওয়াহ করার চেয়েও বেশি জরুরী।

আত্মীয়দের ব্যাপারে আমরা জিজ্ঞাসিত হব ফেসবুকের অচেনা মানুষদের আগেই। ফেসবুকে দাওয়াহ করাটা সহজ, কারো সাথে সম্পর্ক খারাপ হলে তেমন কিছু যায় আসে না, ফ্রেন্ডের এখানে অভাব নেই। কিন্তু আত্মীয়দের দাওয়াহ করতে গেলে যে আবু লাহাব আবিশষ্কার করার আশংকা আছে। কিন্তু এই ভয়টুকু তো কাটাতে হবে। এই এক দেড় ঘন্টা সময়ে এই কাজটুকু করা যায় ইন শা আল্লাহ। এটাই তো পরীক্ষা। আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিন। ফেসবুকের ফিতনা থেকে আমাদের দূরে রাখুন। আমীন।

সম্পাদকের মন্তব্য: এই দ্বীনি বোনের মতো আমাদেরও ভাবা উচিত যে, আমরা দাওয়াতের অন্য ক্ষেত্রকে ব্যবহার করার এবং এই সামাজিক মিডিয়াগুলোর ফিতনা থেকে বাঁচার চেষ্টা করা। একান্ত যতটুকু না করলেই নয়, ততটুকুই করা। আল্লাহ আমাদের হিফাযাত করুন।

সূত্র:

মতামত দিন