কুরআন

কুরআন তিলাওয়াতের আদব ও ফযীলত

রচনায়: সাজ্জাদ সালাদীন

কুরআন আল্লাহর বাণী। সৃষ্টিকুলের উপর যেমন স্রষ্টার সন্মান ও মর্যাদা অপরিসীম, তেমনি সকল বাণীর উপর কুরআনের মর্যাদা ও শ্রেষ্টত্য অতুলনীয়। মানুষের মূখ থেকে যা উচ্চারিত হয়, তম্মধ্যে কুরআন পাঠ সর্বাধিক উত্তম।

কুরআন শিক্ষা করা, অন্যকে শিক্ষা দান করা ও কুরআন অধ্যয়ন করার মধ্যে রয়েছে অফুরন্ত ফযীলত। অধিকাংশ মানুষই আজ কুরআন শিক্ষা থেকে উদাসীন। বড়রা ব্যস্ত দুনিয়া আর দুনিয়াদারি নিয়ে। ছোটরা ব্যস্ত স্কুলের রুটিন নিয়েঅ যেখানে কুরআন শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া হয় না। যথাযথ যত্নও নেয়া হয় না। শিক্ষকরাও তাদের প্রতি কাম্য দায়িত্ব পালন করেন না। আর তাদের অবশিষ্ট সময় অপচয় হয় রাস্তা-ঘাটে খেলাধুলার পেছনে। ফলে তারা কুরআন সম্পর্কে অজ্ঞ হয়ে বেড়ে উঠছে। তাই দেখা যায় বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে বড় হচ্ছে অথচ শুদ্ধভাবে আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াতও পড়তে পারে না। এজন্যই দেখা যায় গ্রামাঞ্চলের অনেক মসজিদেই এখনো শুদ্ধ তিলাওয়াত করতে পারে এমন ইমাম পাওয়া যায় না।

আর এসবের প্রধান কারণ সন্তানদের কুরআন শিক্ষার ব্যাপারে পিতাদের অবহেলা। এদিকটিকে তাদের যথাযথ গুরুত্ব না দেয়া। তারা জানেন না তাদের সন্তান কুরআন পড়তে পারে কি-না। এমনি আজ অধিকাংশ মুসলমানই কুরআনকে ছেড়েই দিয়েছেন। দেখুন আল্লাহর নবী এদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলার কাছে কীভাবে অভিযোগ করছেন-

  • وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَذَا الْقُرْآَنَ مَهْجُورًا (30)

‘আর রাসূল বলবে, ‘হে আমার রব, নিশ্চয় আমার কওম এ কুরআনকে পরিত্যাজ্য গণ্য করেছে।’ (সূরা ফুরকান, আয়াত নং – ৩০)[1]

ইবন কাসির (রহঃ) বলেন, কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করা, কুরআন বুঝতে চেষ্টা না করাও কুরআন পরিত্যাগ করার মধ্যে গণ্য। কুরআনের আমল ছেড়ে দেয়া, এর নির্দেশ পালন না করা এবং নিষেধ উপেক্ষা করাও তা পরিত্যাগ করার মধ্যে গণ্য। এবং কুরআন ছেড়ে অন্য কথা-কাব্যে, অনর্থক বাক্যালাপ ও গান-বাজনায় ডুবে থাকাও পরিত্যাগ করার মধ্যে গণ্য।

কুরআনের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণার আহ্বান

আলহামদুলিল্লাহ আমরা যারা কুরআন শিখেছি, যারা কুরআন পড়তে পারি, তাদের উচিত কুরআনের প্রতি যত্নবান হওয়া। মনোযোগসহ বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা। বিনয় ও আদবের সাথে চিন্তা-গবেষণার মানসিকতা নিয়ে তিলাওয়াত করা। আমরা নিশ্চয় জানি কী বিপুল সওয়াব এ তিলাওয়াতে! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

من قرأ حرفا من كتاب الله فله به حسنة والحسنة بعشر أمثالها لا أقول آلم حرف ولكن ألف حرف ولام حرف وميم حرف

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি আয়াত পড়বে, তার জন্য একটি নেকী লেখা হবে। আর নেকীটিকে করা হবে দশগুণ। আমি বলছি না الم একটি হরফ। বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ, ‘লাম’ একটি হরফ এবং ‘মীম’ একটি হরফ।’[2] সুবহানাল্লাহ!

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহঃ) বলেন, ‘আল্লাহর বাণী (কুরআন) নিয়ে চিন্তা করুন। আপনি এমন এক বাদশাহকে পাবেন, সবই যার রাজত্ব এবং যাবতীয় প্রশংসাও তাঁর। প্রতিটি বিষয়ের গুরুদায়িত্ব তাঁর হাতে। তিনি তাঁর বান্দাদের উপদেশ দেন। যাতে তাদের সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্য নিহিত তাদেরকে তার সন্ধান দেন। তাদেরকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। তাদেরকে সতর্ক করেন সেসব কাজ থেকে যাতে তাদের ধ্বংস ও অকল্যাণ রয়েছে। তিনি তাদের কাছে যাবতীয় গুণাবলি ও নামসহ নিজের পরিচয় তুলে ধরেন। কুরআন স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের ওপর আল্লাহর নেয়ামতসমূহের কথা। আমাদের দায়িত্ব ও জীবনের লক্ষ্যের কথা। আমাদের জন্য নেক কাজের পুরস্কার স্বরূপ যেসব নেয়ামত বেহেশতে রেখেছেন তার কথা। অবাধ্য হলে যেসব শাস্তি রেখেছেন তার কথা। তাঁর বন্ধুদের সুপরিণাম ও শত্রুদের কুপরিণতি সম্পর্কে কুরআন আমাদের সংবাদ দেয়। কুরআন আমাদের জন্য উপমা পেশ করে। দলীল ও ইতিহাস তুলে ধরে। আমাদেরকে শান্তির ঠিকানার দিকে আহ্বান জানায় এবং এর গুণাবলি ও উপকারিতা মনে করিয়ে দেয়। সতর্ক করে শাস্তির ঠিকানা ও তার আজাব থেকে। তাঁর বান্দাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে নিজের দৈন্যতা ও অসহায়ত্বের করুণ চিত্র। বোধে আঘাত করে উপলব্ধিতে আনে তাঁর অনুগ্রহ ছাড়া এক মুহূর্তও আমরা চলতে পারব না। অতএব কুরআন পাঠের মধ্য দিয়ে আমাদের অন্তর যখন দেখবে যে তিনি এমন রাজা, যিনি মহাপরাক্রমশালী, দয়ালু, দাতা ও চিরসুন্দর, তখন সে আর তাঁকে ভুলে থাকতে পারবে না। তাঁর নির্দেশ অমান্য করতে পারবে না।’[3]

কুরআন শিখানোর প্রতিদান

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যাক্তি উত্তম যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে ও অন্যকে তা শিক্ষা দেয়”। (বুখারী)।

ভালো ক্বারীর কাছে গিয়ে কুরআন শিখতে হবে

আমাদের সবার জন্য জরুরি, এমন শিক্ষকের কাছে পবিত্র কুরআন শিক্ষা করা যিনি বিশুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে জানেন। অতএব যিনি নিজে কুরআন শিখবেন বা আপন সন্তানাদিকে শেখাবেন তার কর্তব্য হলো একজন ভালো ক্বারী সাহেবের শরণাপন্ন হওয়া। যাতে বিশুদ্ধভাবে এবং সুন্দর পদ্ধতিতে কুরআন শেখা যায়। মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ তা‘আলার পবিত্র কালাম সবচে বেশি গুরুত্ব ও যত্নের দাবিদার। ইদানীং অনেককেই দেখা যায় আরবী পড়ান। অথচ তিনি নিজেও শুদ্ধভাবে আরবী পড়তে জানেন না। মহিলাদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

মাদ-গুন্না কিছুই জানা নেই, মাসআলা-মাসায়েল জানা নেই। অথচ দিব্যি কুরআনের ওস্তাদি করে যাচ্ছেন। আপনার সন্তানকে এদের হাতে তুলে দেবেন না। যদি বাংলা-ইংরেজি শেখার জন্য ভালো মাস্টারের দরকার হয়, তাহলে আল্লাহর কিতাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখার জন্য তো আরও ভালো ওস্তাদের প্রয়োজন। দুনিয়ার শিক্ষার বেলায় গুরুত্ব দেই অথচ আখিরাতের শিক্ষার বেলায় অবহেলা করি- এটা তো ঈমানের দাবি হতে পারে না। যে আল্লাহ আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান শেখার মতো বুদ্ধি ও মেধা দিলেন তাঁর কিতাব পড়ার ব্যাপারে এমন অবহেলা কি চরম অকৃতজ্ঞতার পরিচায়ক নয়? আমাদের চিন্তা করা উচিৎ, তিনি যদি আমাকে বা আমার সন্তানকে পাগল বানিয়ে দেন তাহলে কী অবস্থা হবে? (আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন)

আমাদের স্কুলগুলোতে নামকাওয়াস্তে একজন করে আরবী শিক্ষক রাখা হয় ঠিক; কিন্তু আরবী বিষয়কে করা হয় চরম অবহেলা। সাধারণ শিক্ষার টিচার নিয়োগ, নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ের জন্য রাষ্ট্র কত ব্যবস্থা আর উদ্যোগ নেয়। অথচ কুরআন শিক্ষা ও কুরআনের শিক্ষা নিয়ে আমাদের সরকার বা স্কুল কর্তৃপক্ষের যেন কোনো মাথা ব্যাথাই নেই। বৃটিশ আমল থেকে যেনতেন একজন ধর্মীয় শিক্ষক রাখার নিয়ম চলে আসছে, তা রক্ষা হলেই চলে। স্কুলে এই আরবী শিক্ষককে কোনো দামই দেয়া হয় না। তাঁর পরামর্শ ও পরিকল্পনার প্রতি ভ্রুক্ষেপই করা হয় না। ব্যস, বার্ষিক মিলাদ-মাহফিলের সময় শুধু তাঁকে সামনে এগিয়ে দেয়া হয়। সত্যি কথা বলতে কী, কুরআন ও কুরআনের শিক্ষার প্রতি এই ঔদাসীন্যের কারণেই সমাজে শিক্ষিতের হার বাড়ছে ঠিক; কিন্তু নীতিবান ও আদর্শ দেশ প্রেমিকের সংখ্যা বাড়ছে না। সমাজের প্রতি শাখায়, প্রতিটি পরিবারে শিক্ষিত সন্তানদের নিয়েও বিপদে দিন গুজরান করছেন অসহায় অভিভাবকরা। আল্লাহ মাফ করুন, আমরা অভিভাবকদের বুঝতে হবে কুরআনের প্রতি আমাদের অনাদরের কারণেই আমাদের ছেলেমেয়েরা মানুষ হচ্ছে না। প্রতিটি মুসলিম সরকারের আমাদের কাছে আবেদন, তারা যেন প্রতিটি শিশুর জন্য কুরআনের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন। প্রতিটি শিশুকে কুরআনের আলোয় বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেন। প্রতিটি গ্রামে গ্রামে এবং মসজিদে মসজিদে কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

কুরআন পাঠের প্রতিদান

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি পবিত্র কুর আনের একটি অক্ষর পড়বে, সে একটি নেকী পাবে। আর এ একটি নেকী দশটি নেকীর সমপরিমান”। (তিরমিযী)

‘আবূ আবদুর রহমান (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেসব সাহাবী (রাঃ) আমাদের কুরআন পড়িয়েছেন তারা বলেছেন,

عَنْ أَبِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ قَالَ : حَدَّثَنَا مَنْ كَانَ يُقْرِئُنَا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، أَنَّهُمْ كَانُوا يَقْتَرِئُونَ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَشْرَ آيَاتٍ ، فَلاَ يَأْخُذُونَ فِي الْعَشْرِ الأُخْرَى حَتَّى يَعْلَمُوا مَا فِي هَذِهِ مِنَ الْعِلْمِ وَالْعَمَلِ ، قَالُوا : فَعَلِمْنَا الْعِلْمَ وَالْعَمَلَ.

তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দশ আয়াত শিখতেন। তারপর আরও দশ আয়াত ততক্ষণ শিখতেন না যাবৎ তাঁরা এ কয়টি আয়াতে কী এলেম আছে আর কী আমল আছে, তা না জানতেন। তাঁরা বলেন, সুতরাং আমরা এলেম শিখেছি এবং আমল শিখেছি।’[4]

কুরআন মুখস্থ করার ফযীলত

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করবে এবং তা মুখস্থ করবে (এবং বিধি-বিধানের) প্রতি যত্নবান হবে, সে উচ্চ ফেরেশতাদের সাথে অবস্থান করবে। আর যে ব্যক্তি কষ্ট হওয়া সত্বেও কুরআন পাঠ করবে এবং তার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখবে সে দ্বিগুন ছওয়াবের অধিকারী হবে”। (বুখারী ও মুসলিম)।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “কিয়ামত দিবসে কুরআন অধ্যায়ন কারীকে বলা হবে, কুরআন পড় এবং উপরে উঠ। যেভাবে দুনুয়াতে তারতীলের সাথে কুরআন পড়তে সেভাবে পড়। যেখানে তোমার আয়াত পাঠ করা শেষ হবে, জান্নাতের সেই সুউচ্চ স্থানে হবে তোমার বাসস্থান”। (তিরমিযী)।

ইমাম খাত্তাবী (রহঃ) বলেন, হাদীসে এসেছে যে, জান্নাতের সিঁড়ির সংখ্যা হচ্ছে কুরআনের আয়াতের সংখ্যা পরিমান। কুরআনের পাঠককে বলা হবে, তুমি যতটুকু কুরআন পড়েছো ততটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠো। যে ব্যক্তি সম্পূর্ন কুরআন পড়েছে, সে আখেরাতে জান্নাতের সর্বশেষ সিঁড়িতে উঠে যাবে। যে ব্যক্তি কুরআনের কিছু অংশ পড়েছে সে ততটুকু উপরে উঠবে। অর্থাৎ যেখানে তার পড়া শেষ হবে সেখানে তার ছওয়াবের শেষ সীমানা হবে।

যার সন্তান কুরআন শিক্ষা করবে তার প্রতিদান

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করবে, শিক্ষা করবে ও তদানুযায়ী আমল করবে। তার পিতা-মাতাকে কিয়ামতের দিন একটি নুরের তাজ পরিধান করানো হবে, যার আলো হবে সূর্যের আলোর মত উজ্জ্বল। তাদেরকে এমন দুটি পোষাক পরিধান করানো হবে, যা দুনিয়ার সকল বস্তুর চেয়ে অধিক মূল্যবান। তারা বলবে, কোন আমলের কারনে আমাদেরকে এত মূল্যবান পোষাক পরানো হয়েছে? বলা হবে, তোমাদের সন্তানের কুরআন গ্রহন করার কারনে”।

পরকালে কুরআন সুপারিশ করবে

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা কিয়ামত দিবসে কুরআন তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হবে”। (মুসলিম)। রাসুলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেন, কিয়ামত দিবসে সিয়াম ও কুরআন বান্দার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে”। (আহমাদ, হামেক, হাদীছ ছহীহ তারগীব তারহীব হা/৯৮৪।)

কুরআন তেলাওয়াত, অধ্যয়ন এবং কুরআন নিয়ে আলোচনা- পর্যালোচনার জন্য একত্রিত হওয়ার ফযীলত

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “কোন সম্প্রদায় যদি আল্লাহর কোন ঘোরে একত্রিত হয়ে কুরআন পাঠ করে এবং তা পরস্পরে শিক্ষা লাভ করে, তবে তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল হয়, আল্লাহর রহমত তাদেরকে আচ্ছাদিত করে এবং ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে। আর আল্লাহ তাঁর নিকটস্থ ফেরেশতাদের সামনে তাদের কথা আলোচনা করেন”। (মুসলিম)

কুরআন পাঠের আদব

ইমাম ইবনে কাছীর কুরআন পাঠের কিছু আদব উল্লেখ করেছেন। যেমন,

ক) পবিত্রতা না করে কুরআন স্পর্শ করবে না বা তেলোয়াত করবে না।

খ) কুরআন পাঠের পূর্বে মেসওয়াক করে নিবে।

গ) সুন্দর পোষাক পরিধান করবে।

ঘ) কিবলামুখী হয়ে বসবে।

ঙ) হাই উঠলে কুরআন পড়া বন্ধ করে দেবে।

চ) বিনা প্রয়োজনে কুরআন পড়া অবস্থায় কারো সাথে কথা বলবে না।

ছ) মনযোগ সহকারে কুরআন পাঠ করবে।

জ) ছওয়াবের আয়াত পাঠ করলে থামবে এবং আল্লাহর কাছে উক্ত ছওয়ার প্রার্থনা করবে। আর শাস্তির আয়াত পাঠ করলে তা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে।

ঝ) কুরআনকে খুলে রাখবে না বা তার উপর কোন কিছু চাপিয়ে রাখবে না।

ঞ) অন্যের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় এমন উচ্চ আওয়াজে কুরআন পড়বে না।

ট) বাজারে বা এমন স্থানে কুর আন পড়বে না যেখানে মানুষ আজে-বাজে
কথা-কাজে লিপ্ত থাকে।

কিভাবে কুরআন পাঠ করবে?

আনাস বিন মালেক (রাঃ) কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কুরআন পাঠের পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “তিনি টেনে টেনে পড়তেন। “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” পাঠ করার সময় “বিসমিল্লাহ” টেনে পড়তেন, “আর রাহমান” টেনে পড়তেন, “আর রাহীম” টেনে পড়তেন”। (বুখারী)

কিভাবে কুরআন পাঠের ছওয়াব বৃদ্ধি হয়?

যে ব্যক্তিই আল্লাহর উদ্দেশ্যে একনিষ্টভাবে কুরআন পাঠ করবে সেই তার ছওয়াবের অধিকারী হবে। কিন্তু এই ছওয়াব বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে যখন অন্তর-মন উপস্থিত রেখে আয়াতগুলোর অর্থ বুঝে গবেষণার দৃষ্টি নিয়ে তা পাঠ করবে। তখন একেকটি অক্ষরের বিনিময়ে দশ থেকে সত্তর গুন ; কখনো সাতশত গুন পর্যন্ত ছওয়াব বৃদ্ধি করা হবে।

দিনে-রাতে কতটুকু কুরআন পাঠ করবে

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন তেলাওয়াত করতেন। তাঁদের কেউ সাত দিনের কম সময়ে সর্বদা কুরআন খতম করতেন না। বরং তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করার ব্যাপারে হাদীছে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
অতএব সন্মানিত পাঠক! আপনার সময়ের নির্দিষ্ট একটি অংশ কুরআন পাঠের জন্য নির্ধারণ করুন। যত ব্যস্তই থাকুন না কেন ঐ অংশটুকু পড়ে নিতে সচেষ্ট হোন। কেননা যে কাজ সর্বদা করা হয় তা অল্প হলেও বিচ্ছিন্নভাবে বেশী কাজ করার চেয়ে উত্তম। যদি কখনো উদাসীন হয়ে পড়েন বা ভুলে যান তবে পরবর্তী দিন তা পড়ে ফেলবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “কোন মানুষ যদি কুরআনের নির্দিষ্ট অংশ না পড়েই ঘুমিয়ে পড়ে তবে ফজর ও যোহর নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে যেন তা পড়ে নেয়। তাহলে তার আমল নামায় উহা রাতে পড়ার মত ছওয়াব লিখে দেয়া হবে”। (মুসলিম)।

আল্লাহ আমাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত করার ও এ অনুযায়ী পথ চলার তাওফিক দিন। আমীন।

তথ্যসূত্র:

[1] সূরা ফুরকান, আয়াত নং – ৩০

[2] তিরমিযী : ২৯১০।

[3] আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন : ৪২৪২।

[4]  মুসনাদ আহমদ : ২৩৫৬৯; আবদুর রাযযাক, মুসান্নাফ : ৩০৫৪৯।

মতামত দিন