পর্যালোচনা

দল, ইমারত ও বায়আত সম্পর্কে উলামাগণের বক্তব্য (পর্ব ৯)

দল, সংগঠন, ইমারত ও বায়‘আত সম্পর্কে বিশিষ্ট উলামায়ে কেরামের বক্তব্য (নবম পর্ব)

আলী ইবনে হাসান ইবনে আব্দুল হামীদ আল-হালাবী আল-আছারী([1])

শায়খ আলী আল-হালাবী বায়‘আত সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বায়‘আত সম্পর্কে অনেকগুলি সংশয় এবং সেগুলোর জবাব দিয়েছেন। নীচে আমাদের বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত পঞ্চম সংশয়টির বঙ্গানুবাদ করা হলঃ

পঞ্চম সংশয়ঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তিন জন সফরে বের হলে তারা তাদের একজনকে আমীর হিসাবে নিযুক্ত করবে’। উক্ত হাদীছে সফর অবস্থায় আমীর নিযুক্ত করার অপরিহার্যতা প্রমাণিত হয়েছে। সফর অবস্থায় যদি এই বিধান বলবৎ থাকে, তাহলে আল্লাহর পথে দা‘ওয়াতী ক্ষেত্রে মুক্বীম অবস্থায় আমীর নিযুক্ত করে শপথ ও বায়‘আত গ্রহণ ওয়াজিব হওয়া অধিকতর যুক্তিসঙ্গত নয় কি?

জবাবঃ                        

১. সফর অবস্থায় আমীর নিযুক্তের ক্ষেত্রে স্পষ্ট দলীল (نص) এসেছে। কিন্তু মুক্বীম অবস্থায় আমীর নিযুক্তের ক্ষেত্রে কোনো দলীল নেই। আর এখানে ‘কারণ’ (علة) এক না হওয়ায় সফর অবস্থার উপর মুক্বীম অবস্থার ক্বিয়াস গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া ক্বিয়াস করা মুজতাহিদ আলেমগণের জন্যই শোভা পায়, অন্য কারো জন্য নয়।

২. সফরে নিযুক্ত আমীরের ‘ইমারত’ সফর শেষ হওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু মুক্বীম অবস্থা এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। কেননা সেখানে সর্বদা পূর্ণ আনুগত্য বজায় রাখতে হয়।

৩. সফরে আমীর নিযুক্তকরণে উপকার ছাড়া বিন্দুমাত্র ক্ষতির আশংকা নেই। কিন্তু মুক্বীম অবস্থায় আমীর নিযুক্ত করলে তা মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও ফাসাদ সৃষ্টি করে। সুতরাং উভয় অবস্থার মধ্যে কোনো তুলনাই চলে না।

৪. যদি কিছু মানুষ মদ পানকারী ও যেনাকারী উপর শরী‘আতের ‘হদ্দ’ কার্যকর করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে কি সেটি গ্রহণযোগ্য হবে? কখনই না। কারণ, শুধুমাত্র রাষ্ট্রের শাসক শরী‘আতের ‘হদ্দ’ কার্যকর করতে পারেন। অতএব, এখানে যেমন রাষ্ট্রের শাসকের উপর অন্য কাউকে ক্বিয়াস করা অগ্রহণযোগ্য, তেমনিভাবে সফর অবস্থায় আমীর নিযুক্তের উপর মুক্বীম অবস্থায় আমীর নিযুক্তের বিষয়টি ক্বিয়াস করাও অগ্রহণযোগ্য।

৫. সফর অবস্থায় নিযুক্ত আমীরের আনুগত্য সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; বরং সফরের সঠিক ব্যবস্থাপনা সহ সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এখানে পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য প্রযোজ্য নয়।

৬. মুক্বীম অবস্থার বায়‘আতকে যদি শপথ ও অঙ্গীকার বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে বলব, এমনকি এসব শপথ ও অঙ্গীকারও আমাদের সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি নয়। বরং তাঁদের অবস্থান ছিল এর সম্পূর্ণ উল্টো। হাফেয আবু নু‘আইম তাঁর ‘হিল্‌ইয়াতুল আউলিয়াহ’ গ্রন্থে (২/২০৪) মুতাররিফ ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে ছহীহ সনদে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমরা যায়েদ ইবনে ছওহানের নিকট আসলে তিনি আব্দুল্লাহকে ডেকে বলতেন, তাদেরকে সম্মান কর এবং তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার কর। কারণ, দু’টি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাছিল করা যায়: ১. তার শাস্তির ভয় ২. জান্নাত লাভের প্রত্যাশা। অতঃপর অন্য একদিন তাঁর নিকট এসে দেখলাম তারা একটি কাগজে বেশ কিছু কথা লিখেছে। কথাগুলি এভাবে সাজানো ছিলঃ ‘মহান আল্লাহ আমাদের প্রভূ, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নবী, কুরআন আমাদের আদর্শ। যে আমাদের সাথে থাকবে, সে আমাদেরই একজন এবং আমরা তাকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করব। পক্ষান্তরে যে আমাদের বিরোধিতা করবে, আমরা তার সাথে শত্রুতা পোষণ করব। আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকব, আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকব’। কাগজটি উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তিকে দিয়ে জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল, ‘তুমি কি এর প্রতি সম্মতি প্রদান করছ’?….অতঃপর কাগজটি আমার নিকট পৌঁছলে আমাকে একই কথা জিজ্ঞেস করা হলো। আমি বললাম, না, আমি সম্মতি প্রদান করছি না। তখন যায়েদ ইবনে ছওহান বললেন, এ বালককে আরো অবকাশ দাও, হয়তো সে তার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসবে। তারপর তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি তোমার সপক্ষে যুক্তি পেশ কর। আমি বললাম, মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে আমার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন, আমি সে অঙ্গীকার ব্যতীত অন্য কারো কাছে কস্মিনকালেও নতুন কোনো অঙ্গীকার করব না। আমি একথা বলার পর সকলেই তাদের অবস্থান থেকে ফিরে আসলেন, কেউই আর কাগজে লেখা কথাগুলির প্রতি অঙ্গীকারে সম্মত হলেন না। তারা আনুমানিক ৩০ জন ছিলেন।

বর্ণনাটি উল্লেখ করার পর শায়খ আলী আল-আছারী বলেন, লক্ষ্য করুন, হক গ্রহণ এবং হকের কাছে আত্মসমর্পণের ক্ষেত্রে তাঁদের কি চমৎকার ভূমিকা এবং অবস্থান। দেখুন, যে বিষয়টি পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয় এবং যেটি উম্মতের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে সেটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে হক মনে হলেও তাঁরা কি সহজে সেটিকে বর্জন করতেন। ([2])

তিনি বিভিন্ন সংগঠন এবং তাতে যোগদান প্রসঙ্গে বলেন, আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, এসব সংগঠন, আন্দোলন এবং দল ‘জামা‘আতুল মুসলিমীনের’ অন্তর্ভুক্ত; তবে সেগুলো ‘জামা‘আতুল মুসলিমীন’ নয়। তেমনিভাবে যিনি কোনো ইসলামী সংগঠন বা আন্দোলনে যোগ দিবেন না, তিনি জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন বিবেচিত হবেন না এবং তার মৃত্যু জাহেলী মৃত্যু গণ্য করা হবে না।([3])

 তথ্যসূত্র :

([1]) শায়খ আলী ইবনে হাসান ১৩৮০ হিজরীতে জর্দানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শায়খ আলবানীর খুব ঘনিষ্ঠ ছাত্র ছিলেন। আলবানী, ইবনে বায, মুক্ববিল আল-ওয়াদেঈ, বকর আবু যায়েদ, আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ প্রমুখ বিদ্বানগণ তাঁর প্রশংসা করেছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছেঃ ১. আদ-দা‘ওয়াহ ইলাল্লাহ বায়নাত্‌-তাজাম্মুইল হিযবী ওয়াত-তা‘আউন আশ-শারঈ ২. রু’ইয়া ওয়াক্বে‘ইয়াহ ফিল-মানাহিজ্‌ আদ-দা‘বিইয়াহ।

([2]) আলী ইবনে হাসান, (আল বায়‘আহ বায়নাস্‌-সুন্নাতি ওয়াল-বিদ‘আহ ইনদাল জামা‘আতিল ইসলামিইয়াহ, আল-মাকতাবাহ আল-ইসলামিইয়াহ, জর্ডান, প্রথম প্রিন্ট: ১৪০৬হিঃ), পৃষ্ঠাঃ ৩৮-৪০।

([3]) আলী ইবনে হাসানঃ আদ-দা‘ওয়াহ ইলাল্লাহ বায়নাত-তাজাম্মু‘ আল-হিযবী ওয়াত-তা‘আউন আশ-শার‘ঈ, পৃষ্ঠাঃ ৯৩।

মতামত দিন