সলাত

স্বলাতে মুবাশ্‌শির (পর্ব ১১)

রচনায় :- আব্দুল হামীদ ফাইযী

আযান ও তার মাহাত্ম

আযান ফরয এবং তা দেওয়া হল ফরযে কিফায়াহ্‌। আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, “নামাযের সময় উপস্থিত হলে তোমাদের একজন আযান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে যে বড় সে ইমামতি করবে।” (বুখারী ৬২৮নং, মুসলিম, নাসাঈ, সুনান, দারেমী, সুনান)

আযান ইসলামের অন্যতম নিদর্শন ও প্রতীক। কোন গ্রাম বা শহরবাসী তা ত্যাগ করলে ইমাম (রাষ্ট্রপ্রধান) তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবেন। যেমন মহানবী (সাঃ) অভিযানে গেলে কোন জনপদ থেকে আযানের ধ্বনি শুনলে তাদের উপর আক্রমণ করতেন না। (বুখারী ৬১০ নং, মুসলিম, সহীহ)

সফরে একা থাকলে অথবা মসজিদ খুবই দূর হলে এবং আযান শুনতে না পাওয়া গেলে একাই আযান ও ইকামত দিয়ে নামায পড়া সুন্নত। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্‌, সঊদী উলামা-কমিটি ১/২৫৫)

আযান দেওয়ায় (মুআযযেনের জন্য) রয়েছে বড় সওয়াব ও ফযীলত। মহান আল্লাহ বলেন, “সে ব্যক্তি অপেক্ষা আর কার কথা উৎকৃষ্ট, যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করে, সৎকাজ করে এবং বলে আমি একজন ‘মুসলিম’ (আত্মসমর্পণকারী)?” (সূরা ফুসসিলাত, আয়াত নং-৩৩)

প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন, “লোকে যদি আযান ও প্রথম কাতারের মাহাত্ম জানত, অতঃপর তা লাভের জন্য লটারি করা ছাড়া আর অন্য কোন উপায় না পেত, তাহলে তারা লটারিই করত।” (বুখারী ৬১৫, মুসলিম, সহীহ ৪৩৭নং)

“আল্লাহ প্রথম কাতারের উপর রহ্‌মত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশ্‌তাগণ তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। মুআযযিনকে তার আযানের আওয়াযের উচ্চতা অনুযায়ী ক্ষমা করা হয়। তার আযান শ্রবণকারী প্রত্যেক সরস বা নীরস বস্তু তার কথার সত্যায়ন করে থাকে। তার সাথে যারা নামায পড়ে তাদের সকলের নেকীর সমপরিমাণ তার নেকী লাভ হয়।” (আহ্‌মদ, নাসাঈ, সহীহ তারগীব ২২৮নং)

“কিয়ামতের দিন মুআযযিনগণের গর্দান অন্যান্য লোকেদের চেয়ে লম্বা হবে।” (মুসলিম, সহীহ৩৮৭নং)

 “যে ব্যক্তি বারো বৎসর আযান দেবে তার জন্য জান্নাত ওয়াজেব হয়ে যাবে। আর প্রত্যেক দিন আযানের দরুন তার আমল নামায় ষাটটি নেকী লিপিবদ্ধ করা হবে এবং তার ইকামতের দরুন লিপিবদ্ধ হবে ত্রিশটি নেকী।” (ইবনে মাজাহ্‌, দারাকুত্বনী,হাকেম, সহীহ তারগীব ২৪০নং)

আযানের প্রারম্ভিক ইতিহাস

মক্কায় অবস্থানকালে মহানবী (সাঃ) তথা মুসলিমগণ বিনা আযানে নামায পড়েছেন। অতঃপর মদীনায় হিজরত করলে হিজরী ১ম (মতান্তরে ২য়) সনে আযান ফরয হয়। (ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/৭৮)

সকল মুসলমানকে একত্রে সমবেত করে জামাআতবদ্ধভাবে নামায পড়ার জন্য এমন এক জিনিসের প্রয়োজন ছিল, যা শুনে বা দেখে তাঁরা জমা হতে পারতেন। এ জন্যে তাঁরা পূর্ব থেকেই মসজিদে উপস্থিত হয়ে নামাযের অপেক্ষা করতেন। এ মর্মে তাঁরা একদিন পরামর্শ করলেন; কেউ বললেন, ‘নাসারাদের ঘন্টার মত আমরাও ঘন্টা ব্যবহার করব।’ কেউ কেউ বললেন, ‘বরং ইয়াহুদীদের শৃঙ্গের মত শৃঙ্গ ব্যবহার করব।’ হযরত উমার (রাঃ) বললেন, ‘বরং নামাযের প্রতি আহ্বান করার জন্য একটি লোককে (গলি-গলি) পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়?’ কিন্তু মহানবী (সাঃ) বললেন, “হে বিলাল! ওঠ, নামাযের জন্য আহ্বান কর।”(বুখারী ৬০৪ , মুসলিম, সহীহ)

কেউ বললেন, ‘নামাযের সময় মসজিদে একটি পতাকা উত্তোলন করা হোক। লোকেরা তা দেখে একে অপরকে নামাযের সময় জানিয়ে দেবে।’ কিন্তু মহানবী (সাঃ) এ সব পছন্দ করলেন না। (আবূদাঊদ, সুনান ৪৯৮নং) পরিশেষে তিনি একটি ঘন্টা নির্মাণের আদেশ দিলেন। এই অবসরে আব্দুল্লাহ বিন যায়দ (রাঃ) স্বপ্নে দেখলেন, এক ব্যক্তি ঘন্টা হাতে যাচ্ছে। আব্দুল্লাহ বলেন, আমি তাকে বললাম, ‘হে আল্লাহর বান্দা! ঘন্টাটি বিক্রয় করবে?’ লোকটি বলল, ‘এটা নিয়ে কি করবে?’ আমি বললাম, ‘ওটা দিয়ে লোকেদেরকে নামাযের জন্য আহ্বান করব।’ লোকটি বলল, ‘আমি তোমাকে এর চাইতে উত্তম জিনিসের কথা বলে দেব না কি?’ আমি বললাম, ‘অবশ্যই।’

তখন ঐ ব্যক্তি আব্দুল্লাহকে আযান ও ইকামত শিখিয়ে দিল। অতঃপর সকাল হলে তিনি রসূল (সাঃ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে স্বপ্নের কথা খুলে বললেন। সব কিছু শুনে মহানবী (সাঃ) বললেন, “ইনশাআল্লাহ! এটি সত্য স্বপ্ন। অতএব তুমি বিলালের সাথে দাঁড়াও এবং স্বপ্নে যেমন (আযান) শুনেছ ঠিক তেমনি বিলালকে শুনাও; সে ঐ সব বলে আযান দিক। কারণ, বিলালের আওয়াজ তোমার চেয়ে উচ্চ।”

অতঃপর আব্দুল্লাহ (রাঃ) স্বপ্নে প্রাপ্ত আযানের ঐ শব্দগুলো বিলাল (রাঃ) কে শুনাতে লাগলেন এবং বিলাল (রাঃ) উচ্চস্বরে আযান দিতে শুরু করলেন। উমার (রাঃ) নিজ ঘর হতেই আযানের শব্দ শুনতে পেয়ে চাদর ছেঁচড়ে (তাড়াতাড়ি) বের হয়ে মহানবী (সাঃ) এর নিকট উপস্থিত হলেন; বললেন, ‘সেই সত্তার কসম, হে আল্লাহর রসূল! আমিও (২০ দিন পূর্বে) স্বপ্নে ঐরুপ দেখেছি।’ আল্লাহর রসূল (সাঃ) তাঁকে বললেন, “অতএব যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই।” (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান ৪৯৮-৪৯৯, তিরমিযী, সুনান ১৮৯, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ৭০৬নং)

“যে কোন মানুষ, জ্বিন বা অন্য কিছু মুআযযিনের  আযানের শব্দ শুনতে পাবে, সেই মুআযযিনের জন্য কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য প্রদান করবে।” (বুখারী ৬০৯ নং)

আযানের শব্দাবলী

মহানবী (সাঃ) এর মুআযযিন ছিল মোট ৪ জন। মদীনায় ২ জন; বিলাল বিন রাবাহ ও আম্‌র বিন উম্মে মাকতূম কুরাইশী। আম্‌র ছিলেন অন্ধ। আর কুবায় ছিলেন সা’দ আল-কুর্য। মক্কায় আবূ মাহযূরাহ আওস বিন মুগীরাহ জুমাহী। (যাদুল মাআদ, ইবনুল কাইয়েম ১/১২৪)

আব্দুল্লাহ বিন যায়দ (রাঃ) এর বর্ণিত বিলাল (রাঃ) এর আযান ছিল নিম্নরুপ:-

اَللهُ أَكْبَر  (আল্লা-হু আকবার) ৪ বার।

أَشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلهَ إِلاَّ الله (আশহাদু আল লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ্‌) ২ বার।

أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً رَّسُوْلُ الله (আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লা-হ্‌) ২ বার।

حَيَّ عَلَى الصَّلاَة(হাইয়্যা আলাস স্বলা-হ্‌) ২ বার।

حَيَّ عَلَى الْفَلاَح(হাইয়্যা আলাল ফালা-হ্‌) ২ বার।

اَللهُ أَكْبَر  (আল্লা-হু আকবার) ২ বার।

 لا إِلهَ إِلاَّ الله(লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ্‌) ১ বার। (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান ৪৯৯নং)

আবূ মাহ্‌যূরাহ্‌ (রাঃ) কে আল্লাহর রসূল (সাঃ) নিম্নরুপ আযান শিখিয়েছিলেন:-

اَللهُ أَكْبَر  (আল্লাহ সবার চেয়ে মহান) ৪ বার।

أَشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلهَ إِلاَّ الله (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ভিন্ন কোন সত্য উপাস্য নেই।) ২বার চুপে চুপে।

أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً رَّسُوْلُ الله (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রসূল।) ২ বার চুপে চুপে।

পুনরায়  أشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلهَ إِلاَّ الله ২বার উচ্চস্বরে।

أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً رَّسُوْلُ الله ২বার উচ্চস্বরে।

حَيَّ عَلَى الصَّلاَة  (এস নামাযের জন্য) ২ বার।

حَيَّ عَلَى الْفَلاَح(এস মুক্তির জন্য) ২ বার।

اَللهُ أَكْبَر  (আল্লাহ সবার চেয়ে মহান) ২ বার।

 لاَ إِلهَ إِلاَّ الله(আল্লাহ ভিন্ন কোন সত্য মা’বূদ নেই।) ১ বার।

আর এই আযানকে ‘তারজী’ আযান’ বলা হয়। (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান ৫০০নং, তিরমিযী, সুনান, নাসাঈ, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান)

ফজরের আযান হলে  حيَّ عَلَى الْفَلاَح এর পরে ২ বার বলতে হয়,

اَلصَّلاَةُ خَيْرٌ مِّنَ النَّوْم (আসস্বলা-তু খাইরুম মিনান্‌ নাওম। অর্থাৎ, নিদ্রা অপেক্ষা নামায উত্তম। (ঐ)

মতামত দিন