সিয়াম

আমরা কি রসূল (স.) এর নির্দেশ অনুযায়ী সঠিক সময়ে সাহরী ও ইফতার করতেছি ?

আমরা কি রসূল (স.) এর নির্দেশ অনুযায়ী সঠিক সময়ে সাহরী ও ইফতার করতেছি?

(অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পোষ্ট)

আস্-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ্।

যতটুকু লিখেছি তা লিখতে ৬-৭ ঘন্টা লেগেছে কারণ যা লিখেছি তা দলিল-প্রমাণ সহকারে লিখেছি এবং এই রেফারেন্সগুলো নিজের কাছে থাকা হাদীস গ্রন্থ থেকে খুজে বের করতেই এত সময় লেগেছে। তাই সবাইকে সময় নিয়ে অত্যন্ত মনযোগ দিয়ে পোষ্টটি পড়ার এবং অন্যের সাথে শেযার করার অনুরোধ করে শুরু করছিঃ

ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ এর ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ ‘পবিত্র রমযান ১৪৩৫ হিজরি মাসের সাহরী ও ইফতারের সময়সূচি’ শিরোনামে ২৯ টি রোজার একটি ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করেছে। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১ম রমযান শুরু হচ্ছে ৩০ জুন এবং ঐ দিন (সোমবার) ঢাকা জেলায় সাহরীর শেষ সময় ভোর ৩ টা ৪২ মিনিটে, ফজরের ওয়াক্ত শুরু ৩ টা ৪৮ মিনেটে এবং ইফতারের সময় সন্ধা ৬ টা ৫৩ মিনিটে।

ক্যালেন্ডারের নিচে বিশেষ দ্রষ্টব্য (বি.দ্র.) আকারে যা লিখা আছে হবুহু তাই লিখে দিলাম “সাহরীর শেষ সময় সতর্কতামূলকভাবে সুবহি সাদিকের ৩ মিনিট পূর্বে ধরা হয়েছে এবং ফজরের ওয়াক্তের শুরু সুবহি সাদিকের ৩ মিনিট পর রাখা হয়েছে। অতএব, সাহরীর সতর্কতামূলক শেষ সময়ের ৬ মিনিট পর ফজরের আযান দিতে হবে। সূর্যাস্তের পর সতর্কতামূলকভাবে ৩ মিনিট বাড়িয়ে ইফতারের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।”
লিংকঃ http://www.islamicfoundation.org.bd/news/view/_264.html

চলুন, আমরা সকলেই উপরে প্রদত্ত তথ্যাবলীর ভিত্তিতে ১ম রোজার সাহরী ও ইফতারের সময় গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে বের করিঃ

১. সাহরীর শেষ সময় = ৩ টা ৪২ মিনিট
২. সুবহি সাদিক = সাহরীর শেষ সময় + ৩ মিনিট = ৩ টা ৪২ মিনিট + ৩ মিনিট = ৩ টা ৪৫ মিনিট
৩. ফজরের সময়/আযানের সময় = সুবহি সাদিকের সময় + ৩ মিনিট = ৩ টা ৪৫ মিনিট + ৩ মিনিট
= ৩ টা ৪৮ মিনিট
৪. ইফতারের সময় = সূর্যাস্তের সময় + ৩ মিনিট = ৬ টা ৫৩ মিনিট
৫. সূর্যাস্তের সময় = ইফতারের সময় – ৩ মিনিট = ৬ টা ৫৩ মিনিট – ৩ মিনিট = ৬ টা ৫০ মিনিট

যারা ঢাকাবাসী তারা ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ কর্তৃক প্রদত্ত সময় অনুযায়ী সাহরী ও ইফতার করে থাকে এবং বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার অধিবাসীরা ঢাকার সময় থেকে কয়েক মিনিট বিয়োগ অথবা যোগ করে সাহরী ও ইফতার করে থাকে। যেমন, নোয়াখালীর অধিবাসীরা (আমি বর্তমানে নোয়াখালীতে অবস্থান করছি) ঢাকার সময় থেকে ৩ মিনিট বিয়োগ করে সাহরী ও ইফতার করবে।

অন্যান্য জেলার অধিবাসীদের ঢাকার সময় থেকে কত মিনিট পূর্বে বা পরে সাহরী ও ইফতার করতে হবে তা অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন হয়ে থাকে। সে হিসেবে বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায় ঢাকার সময় থেকে ১-৯ মিনিট পূর্বে বা পরে সাহরী ও ইফতার করতে হবে (ক্যালেন্ডার অনুযায়ী), এটি মেনে নেয়া যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল, ঢাকা জেলার জন্য সাহরী ও ইফতারের যে সময় নির্ধারণ করা হল তা কি রসূল (স.) এর নির্দেশনা অনুযায়ী হয়েছে?

আমাদের প্রিয় নাবী ও রসূল (স.) কি সাহরী ও ইফতারের সময়সূচি নিয়ে এ রকম শর্তাবলী দিয়েছেন? অর্থাৎ রসূল (স.) কি বলেছেন যে, সাহরীর শেষ সময়ের ৬ মিনিট পর ফজরের আযান দিতে হবে এবং সূর্যাস্তের ৩ মিনিট পর ইফতার করতে হবে? যদি রসূল (স.) এ রকম নির্দেশনা না দিয়ে থাকেন, তাহলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ এ রকম নির্দেশনা দেয়ার বা এ রকম ভাবে সময়সূচি প্রণয়ন করার এখতিয়ার কোথা থেকে পেলেন?

তাহলে, চলুন আমরা সাহরী ও ইফতারের সময় সম্পর্কে রসূল (স.) এর নির্দেশনা সহীহ/বিশুদ্ধ হাদীস থেকে জেনে আসিঃ

সাহরীর শেষ সময়ঃ

১. ইবনু মাস’উদ (রা.) হতে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেছেন, “তোমাদের কাউকেই যেন বিলালের আযান অবশ্যই তার সাহরী খাওয়া থেকে বিরত না রাখে। কেননা সে রাতেই আযান দেয়, যাতে তোমাদের ক্বিয়ামকারীগণ (কিয়ামুল লাইল/তাহাজ্জুদ/তারাবীহ সলাত আদায়কারীগণ) সাহরী খেতে শুরু করে এবং ঘুমন্ত ব্যক্তি সাহরী খাওয়ার জন্য জাগে।” –সহীহ মুসলিম (হা/২৪৩১: হাদীস একাডেমী); (হা/২৪০৮: ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং ইসলামিক সেন্টার)
অর্থাৎ বিলাল (রা.) এর আযান ছিল, সাহরী খাওয়া শুরু করার জন্য।

তাহলে সাহরী খাওয়া শেষ করব কখন?
২. ইবনু উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল (স.) এর দু’জন মুয়াযযিন ছিলেন। তারা হলেন, বিলাল (রা.) এবং উম্মু মাকতূমের অন্ধ ছেলে। রসূলুল্লাহ (স.) বলেন: বিলাল (রা.) রাতেই আযান দেয়। অতএব ইবনু উম্মু মাকতূম আযান না দেয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার কর।” –সহীহ মুসলিম (হা/২৪২৮: হাদীস একাডেমী); (হা/২৪০৫: ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং ইসলামিক সেন্টার)

আর আমরা জানি, আযান দেয়া মানে ফজরের ওয়াক্ত হয়ে যাওয়া বা সুবহি সাদিক হওয়া এবং অত্র হাদীস প্রমাণ করে ফজরের আযানের পূর্ব পর্যন্ত সাহরী খাওয়া যাবে এবং আযান শুনার সাথে সাথে সাহরী খাওয়া বন্ধ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে আরো একটি হাদীসঃ
৩. আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বিলাল (রা.) রাতে আযান দিতেন। তাই আল্লাহর রসূল (স.) ইরশাদ করেন, “ইবনু উম্মু মাকতূম (রা.) আযান না দেয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার কর। কেননা ফজর না হওয়া পর্যন্ত সে আযান দেয় না (যতক্ষণ না তাকে বলে দেওয়া হত যে, ‘ভোর হয়েছে, ভোর হয়েছে’ ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি আযান দিতেন না)।” –সহীহ বুখারী (হা/১৯১৮, ৬১৭: তাওহীদ প্রকাশনী)

সাহরী খাওয়া শেষ করার উপযুক্ত সময়ঃ
আমরা জানলাম যে, ফজরের আযান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহরীর সময় শেষ হয়ে যায় অর্থাৎ কেউ যদি কোন কারণে ঘুম থেকে উঠতে দেরি করে ফেলে এবং ঘুম থেকে উঠে দেখে যে, সাহরীর সময় শেষ হতে মাত্র কয়েক মিনিট বাকী আছে, তখন সে আযান শুরু হওয়া পর্যন্ত খেতে পারবে। তবে উত্তম হল, সাহরীর সময় শেষ হওয়ার ১৫/২০ মিনিট আগেই সাহরী খাওয়া শেষ করা।

এ প্রসঙ্গে হাদীসঃ
যায়েদ ইবনু সাবিত (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমরা রসূল (স.) এর সাথে সাহরী খাই, এরপর তিনি সলাতের জন্য দাঁড়ান। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আযান এবং সাহরীর মাঝে কতটুকু ব্যবধান ছিল? তিনি বলেন, পঞ্চাশ আযাত (পাঠ করা) পরিমাণ।” –সহীহ বুখারী (হা/১৯২১, ৫৭৫: তাওহীদ প্রকাশনী)
এখানে আয়াত বলতে মধ্যম ধরণের আয়াত গণ্য হবে, আর এই শ্রেণীর ৫০টি আয়াত পড়তে মোটামুটি ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে।

ইফতার কখন করব?
১. সাহল ইবনু সা’দ (রা.) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রসূল (স.) বলেছেনঃ “লোকেরা যতদিন শীঘ্র ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে।” –সহীহ বুখারী (হা/১৯৫৭: তাওহীদ প্রকাশনী) এবং সহীহ মুসলিম (হা/২৪৪৪: হাদীস একাডেমী); (হা/২৪২১: ইসলামিক ফাউন্ডেশন); (হা/২৪২০: ইসলামিক সেন্টার)
অর্থাৎ আমরা যদি কল্যাণের উপর থাকতে চাই, তবে শীঘ্রই ইফতার করতে হবে। যদি অন্যভাবে বলি, তাহলে বলা যায়, অকল্যাণ অবধারিত যদি আমরা ইফতার দেরিতে করি!

এখন, শীঘ্র ইফতার করতে হবে, সেটি তো বুঝলাম কিন্তু সময়টি কখন? সে সময় কি সূর্য অস্ত যাওয়ার ৩ মিনিট পর? অবশ্যই না। কারণ, আবূ সা’ঈদ খুদরী (রা.) সূর্য এর গোলাকার বৃত্ত অদৃশ্য হওয়ার সাথে সাথেই ইফতার করতেন। [দেখুন-সহীহ বুখারীঃ পর্ব (৩০): সাওম; ৩০/৪৩. অধ্যায়: সায়িমের জন্য কখন ইফতার করা বৈধ]

অনেকে বলতে পারেন, এতো সহাবীর আমল! আমরা রসূল (স.) এর কথা জানতে চাই। অবশ্যই জানব, তার আগে চলুন, মাগরিবের ওয়াক্ত কখন হয়, তা জানার চেষ্টা করিঃ
২. হাদীসটি সালামাহ ইবনুল আকওয়া (রা.) হতে বর্ণিত। “তিনি বলেন, সূর্য অস্তমিত হয়ে অদৃশ্য হলেই রসূলুল্লাহ (স.) মাগরিবের সলাত আদায় করতেন।” -সহীহ মুসলিম (হা/১৩২৬: হাদীস একাডেমী); (হা/১৩১৩: ইসলামিক ফাউন্ডেশন); (হা/১৩২৫: ইসলামিক সেন্টার); আবূ দাউদ (হা/৪১৭)

সুতরাং, আমরা অবগত হলাম যে, সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাগরিবের সময় হয়ে যায়। তাহলে ইফতার কখন করব? অবশ্যই আমরা ইফতার করেই মাগরিবের সলাত আদায় করি, সুতরাং ইফতারও করতে হবে সূর্য ডুবার সঙ্গে সঙ্গে। সেটাও আমরা হাদীস থেকে জানার চেষ্টা করিঃ

৩. সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই ইফতারের সময় হয়ে যায়। কেননা, মাগরিবের সলাতের সময় বর্ণনা করতে গিয়ে সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে [হাদীসটি ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত], রসূল (স.) বলেছেন, “বাইতুল্লাহর নিকট জিবরাঈল (আ.) দুইবার আমার সলাতে ইমামতি করেছেন।…তিনি আমাকে নিয়ে মাগরিবের সলাত আদায় করলেন, যখন সিয়াম পালনকারীর ইফতারের সময় হয়।…” –আবূ দাউদ (হা/৩৯৩:সহীহ-ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
এই হাদীসে মাগরিবের সলাতের সময় ও ইফতারের সময় একই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইফতারের সময় সম্পর্কে আরো দুটি হাদীসঃ
৪. উমার ইবনু খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল (স.) বলেছেনঃ “যখন রাত্র সেদিক হতে ঘনিয়ে আসে ও দিন এ দিক হতে চলে যায় এবং সূর্য ডুবে যায়, তখন সায়িম ইফতার করবে।” –সহীহ বুখারী (হা/১৯৫৪: তাওহীদ প্রকাশনী) এবং সহীহ মুসলিম (হা/২৪৪৮: হাদীস একাডেমী); (হা/২৪২৫: ইসলামিক ফাউন্ডেশন); (হা/২৪২৪: ইসলামিক সেন্টার)

৫. আবূ আত্বিয়্যাহ (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি ও মাসরূক (রহ.) আয়িশাহ (রা.) এর নিকট গিয়ে বলি, হে উম্মুল মুমিনীন! মুহাম্মদ (স.) এর দুইজন সহাবীর একজন সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করেন এবং খুব তাড়াতাড়ি (মাগরিবের) সলাত আদায় করে নেন। আর দ্বিতীয়জন বিলম্বে ইফতার করেন এবং সলাতও বিলম্বে আদায় করেন। তিনি বললেন, তাদের মধ্যে কে ইফতার অনতিবিলম্বে করেন এবং সলাতও তাড়াতাড়ি আদায় করেন? আমরা বললাম, তিনি হচ্ছেন ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস’উদ (রা.)। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) এরুপই করতেন।” –আবূ দাউদ (হা/২৩৫৪:সহীহ- আলবানী প্রকাশনী)

উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে যা জানা গেল তা হচ্ছে, সূর্য অস্তের সময়ই হল একজন সিয়াম পালনকারীর জন্য ইফতারের সময়। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ কর্তৃক যে বলা হল, সূর্যাস্তের পর সতর্কতামূলকভাবে ৩ মিনিট বাড়িয়ে ইফতারের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এটা কেন? এটা কিসের সতর্কতা? সূর্য ডুবেছে কি ডুবেনি, এ সতর্কতা! অথচ, সূর্য কখন অস্ত যাবে, সে সময়টিও কিন্তু আপনারাই (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ) রমযান মাস শুরু হওয়ার বহু পূর্বেই আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আমি এখন জানি যে, ১ম রোজার দিন সূর্য অস্ত যাবে সন্ধা ৬ টা ৫০ মিনিটে। আর হাদীস থেকে জানলাম যে, সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথেই আমাকে ইফতার করতে হবে। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সময়সূচি আমাকে সূর্যাস্তের আরও ৩ মিনিট পরে (৬ টা ৫৩ মিনিটে) ইফতার করতে বলছে। এখন আমি বা আমরা যদি সূর্যাস্তের আরও ৩ মিনিট পরে ইফতার করি, তাহলে কি রসূল (স.) এর হাদীস অনুযায়ী আমল করা হবে? অবশ্যই না।

দেরি করে ইফতার করা কাদের অভ্যাস?
আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। নাবী (স.) বলেছেন, “দ্বীন ততকাল বিজয়ী থাকবে যতকাল মানুষ দ্রুত ইফতার করবে। কেননা ইয়াহুদী-খৃষ্টানরা দেরী করে ইফতার করে।” –আবূ দাউদ (হা/২৩৫৩:হাসান- আলবানী প্রকাশনী)

আমরা কি ইয়াহুদী-খৃষ্টান! যে, প্রতিদিনই আমরা সূর্যাস্তের আরও ৩ মিনিট পরে অর্থাৎ দেরি করে ইফতার করব?

শেষের কথাঃ

অনেকে বলতে পারেন, এ সময় তো নির্ধারণ করা হয়েছে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য, যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে কি আপনার মনে প্রশ্ন জাগে না যে, রসূল (স.) ও তার সহাবীরা এ ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করেছেন কি না? অবশ্যই করেছেন। আর তা হলো, তারা আযান শুনার জন্য সতর্ক হয়ে কান পেতে রাখতেন। তারা সতর্ক থাকতেন যে, কখন ফজরের আযান দিবে, তখন সাহরী খাওয়া বন্ধ করে দিতেন এবং কখন মাগরিবের আযান দিবে, তখন ইফতার করতেন।

হিজরী ১৪৩৫-১৪২৫ সাল পূর্বের ব্যক্তিদের [রসূল (স.) ও তার সহাবীরা] কিন্তু আযান দেয়ার জন্য কোন মাইকের ব্যবস্থা ছিলনা, তাদের সময় দেখার জন্য কিন্তু কোন ঘড়িও ছিল না। শুধু মাত্র একজন ব্যক্তির আযান শুনে [ইবনু উম্মু মাকতূম (রা.)] মাসজিদে নাববী কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা লোকালয়ের অধিবাসীরা সাহরী খাওয়া বন্ধ করে দিতে পারতেন এবং সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করতে পারতেন। আর বর্তমানে তো আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যেই সূর্যাস্তের সময় ও সুবহি সাদিকের সময় জানতে পারতেছি [রেডিও, টি.ভি. কিংবা পত্রিকার মাধ্যমে], তারপরও আমরা ফজরের সময় কিংবা সূর্যাস্তের সময় হয়ে গেলে সাথে সাথেই সাহরী খাওয়া শেষ কিংবা ইফতার শুরু করে দিতে পারি না।

আজকে বিদ্যুৎ নেই, আযান শোনা যাবে না, কিংবা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন তো কি হয়েছে! আমাদের তো আজকে আযান শুনারও দরকার নেই কারণ আমাদের হাতে থাকা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যখন সুবহি সাদিকের বা ফজরের ওয়াক্তের সময় হয়ে যাবে তখন সাহরী খাওয়া বন্ধ করে দিতে পারি আর যখন সূর্য ডুবে যাবে তখন ইফতার করা শুরু করে দিতে পারি। কিন্তু, করি না!

রসূল (স.) ও তার সহাবীরা আযান শুনে সাহরী খাওয়া শেষ করতে পারেন ও ইফতার শুরু করতে পারেন, অথচ আমরা পারি না। আমাদেরকে সুবহি সাদিকের বা ফজরের ওয়াক্তের ৩ মিনিট আগে সাহরী খাওয়ার এবং সুবহি সাদিকের বা ফজরের ওয়াক্তের আরো ৩ মিনিট পর অর্থাৎ সাহরী খাওয়া শেষ করার মোট ৬ মিনিট পর আযান দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এটা কি রসূল (স.) এর নির্দেশের বিরোধিতা না?

রমযান মাসের সিয়াম পালন করা একটি ফরজ ইবাদত। এই ইবাদতটি করতে গেলে আমাদেরকে দিনের শুরুতে সাহরী খেতে হয় এবং দিন শেষে ইফতার করার মাধ্যমে সিয়াম ভঙ্গ করতে হয়। কোন সময় সিয়াম পালন শুরু করব এবং কখন তা ভঙ্গ করব, সে বিষয়ে বিধান দেয়ার ক্ষমতা রাখেন একমাত্র আল্লাহ ও তার রসূল (স.) এবং তা দিয়েছেনও। আর ইসলামিক ফাউন্ডেশন সাহরী ও ইফতারের যে সূচি দিয়েছেন, তা স্পষ্টত রসূল (স.) এর আনীত বিধানের খেলাফ এবং আল্লাহ ও তার রসূল (স.) এর প্রতি মিথ্যারোপ করার শামিল কারণ আমরা যারা এ সময়সূচি অনুযায়ী সাহরী ও ইফতার করছি, তারা কিন্তু মনে করতেছি যে, এভাবে বা এ সমযে সাহরী ও ইফতার করাই তো রসূল (স.) নির্দেশনা। সাথে সাথে এটি একটি বিদ’আত [দ্বীনের মধ্যে পূণ্যের আশায় এমন নতুন কিছু করা যা রসূল (স.) করেন নি]। আর বিদ’আতী কোন আমল ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।

এ প্রসঙ্গে আয়িশাহ (রা.) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, নাবী (স.) বলেছেন, “কেউ আমাদের এ শরী’আতে নাই এমন কিছুর (বিদ’আত) অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত।” –সহীহ বুখারী (হা/২৬৯৭: তাওহীদ প্রকাশনী) এবং সহীহ মুসলিম (হা/৪৩৮৪, ৪৩৮৫: প্রকাশনী-হাদীস একাডেমী); (হা/৪৩৪৩, ৪৩৪৪: প্রকাশনী-ইসলামিক সেন্টার ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

অন্যদিকে, বিদ’আত করলে আল্লাহ ও রসূল (স.) এর প্রতি মিথ্যারোপ করা হয় কারণ আল্লাহ সূরা মায়িদাতে বলে দিয়েছেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলাম কে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনিত করে দিলাম।” -সূরা মায়েদা (৫:৩)

দ্বীন ইসলাম যদি পরিপূর্ণ হয়ে থাকে এবং এই পূর্ণ দ্বীনের ভিতর সাহরী ও ইফতারের এমন কোন সময়সূচি প্রণয়ন করা হয় যা রসূল (স.) এর সূন্নাহর বিরোধী, তাহলে তার দ্বারা মূলত আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করা হয় এবং এই মিথ্যা আরোপকারীর শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যে বলে এবং তার কাছে সত্য আগমন করার পর তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে, তার চেয়ে অধিক যালিম আর কে হতে পারে? কাফেরদের অবস্থান জাহান্নামে নয় কি?” –সূরা যুমার (৩৯:৩২)

অন্যদিকে রসূল (স.) এর প্রতি মিথ্যারোপ করার পরিণতি সম্পর্কে মুগীরাহ (রা.) হতে একটি হাদীস বর্ণিত আছে যেখানে রসূল (স.) বলেছেন,, “আমার উপর মিথ্যারোপ করা (মনগড়া কথা বলা) অন্য কারো উপর মিথ্যারোপ করার মত নয়। যে আমার উপর মিথ্যারোপ করবে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।” –সহীহ বুখারী (হা/১২৯১: তাওহীদ প্রকাশনী)

যা লিখেছি তা সহীহ হাদীস থেকে রেফারেন্স সহকারে লিখেছি। আপনারা হাদীসগুলো মিলিয়ে দেখুন। যদি কারো এর বিপক্ষে কিছু বলার থাকে, তবে প্রজ্ঞার সাথে কোরআন ও সহীহ হাদীসের রেফারেন্স এর মাধ্যমে বিতর্ক করুন, কোন ব্যক্তির কথা বা রায় দিয়ে নয় কারণ ইসলামে কোন ব্যক্তির সকল কথাই গ্রহনীয় নয়, যদি না ঐ ব্যক্তি রসূল (স.) হন।

সুতরাং আসুন, আমরা আমাদের সিয়ামকে শুদ্ধ করার জন্য সঠিক সময়ে সাহরী ও ইফতার করি। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে শুদ্ধভাবে সিয়াম পালন করার তাওফিক দান করুন এবং দ্বীন প্রচারের ক্ষেত্রে আমার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে কবুল করুন। -আমিন

উত্স

মতামত দিন