সীরাত

শামায়েলে মুহাম্মাদী (সাঃ) (পর্ব-৫)

রচনায় :– মুহাম্মাদ হারুন আযিযী নদভী

ক্বামীছ পরিধানের নিয়মঃ

আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ক্বামীছ পরতেন তখন ডান দিক দিয়ে শুরু করতেন।১৪৩

পাগড়ীর বর্ণনাঃ

জাবের (রাঃ) বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিনে মাথায় কাল পাগড়ী পরা অবস্থায় মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন।১৪৪

আমর ইবনে হুরাইছ (রাঃ) বলেন, একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম জনসমক্ষে খুৎবা দেওয়া কালে তাঁর মাথায় কাল একটি পাগড়ী ছিল। ১৪৫

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম যখনপাগড়ী বাঁধতেন, তখন তাঁর পাগড়ীর প্রান্ত দুই কাঁধের মাঝে ঝুলিয়ে দিতেন। ১৪৬

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের সামনে বক্তৃতা কালে তাঁর মাথায় তেল মলিন একটি পাগড়ী ছিল।১৪৭

নতুন কাপড় পরিধানঃ

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন নতুন কাপড় পরিধান করতেন, তখন তিনি প্রথমে কাপড়টির নাম উল্লেখ করতেন-পাগড়ী,ক্বামিছ ও চাদর ইত্যাদি বলে। তারপর এই দোআ পড়তেনঃ-

‘আল্লহুম্মা লাকালহামদু কাসাওতানিহি, আসআলুকা খয়রাহুওয়া খয়রা মা ছুনি’আ লাহু, ওয়া আউযুবিকামিন শাররিহি ওয়া শাররিমা ছুনিয়ালাহু’।১৪৮

পায়জামাঃ

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম পায়জামা ব্যবহার করেছেন বলে কোন ছহীহ বর্ণনা পাওয়া যায়না। তবে তিনি পায়জামা খরিদ করেছিলেন বলে ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।১৪৯

মোজা ব্যবহারঃ

বুরায়দা (রাঃ) বলেন, নাজাশী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য সাদাসিধে দু’টি কাল রংয়ের মোজা হাদিয়া দিলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম তা পরিধান করলেন। তারপর ওযু করলেন এবং তাঁর উপর মাসাহ করলেন।১৫০

মুগীরা (রাঃ) বলেন, দেহইয়া ক্বালবী নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম কে এক জোড়া মোজা হাদিয়া দিলে তিনি তা পরিধান করেন।১৫১

স্যান্ডেল বা জুতাঃ

 ক্বাতাদা (রাঃ) বলেন, আমি আনাস (রাঃ) কে বললাম, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম  এর স্যান্ডেল কিরূপ ছিল? তিনি বললেন, তাঁর উভয় স্যান্ডেলে দু’টি করে চামড়ার ফিতা ছিল।১৫২

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রত্যেকটি স্যান্ডেলে দু’টি করে ফিতা ছিল। ঐ ফিতা দু’টি মূলতঃ একটি ফিতা ছিল এবং তার দু’প্রান্ত স্যান্ডেলের সম্মুখভাবে দুই স্থানে নিবন্ধ ছিল।১৫৩

উবায়েদ ইবনে জুরাইস (রাঃ) বলেন, আমি ইবনে ওমর (রাঃ) কে জিজ্জেস করলাম, আপনাকে প্রায়শঃ লোমশুন্য চামড়ার স্যান্ডেল পরিধান করতে দেখে আসছি, এর কারন কি? তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম কে এরুপ স্যান্ডেল ব্যবহার করতে দেখেছি। বিধায় আমি নিজেও এরুপ পরে থাকি।১৫৪

আমর ইবনে হুরাইস (রাঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম কে তালি দেয়া দু’টি স্যান্ডেল পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।১৫৫

আয়েশা (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চুল আঁচড়ানো, জুতাপরা, ওযু গোসল করা এবং তায়াম্মুমের ব্যাপারেও ডান দিক থেকে আরম্ভ করা পছন্দ করতেন।১৫৬

আংটির ব্যবহারঃ

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম এর আংটি ছিল চাঁদির তৈরী।১৫৭

আনাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম  যখন আরবের বাইরে পত্র লেখার ইচ্ছা করেন তখন তাঁকে বলা হয়, যে পত্রের উপর মোহর অঙ্কিত থাকেনা সে পত্র অনারবরা গ্রহণ করেন না। কাজেই তিনি একটি আংটি বানিয়েনেন।১৫৮

আনাস (রাঃ) অন্যত্র বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম এর আংটিতে আংকিত ছিল, ‘মুহাম্মাদ’ এক লাইনে, ‘রসূল’ এক লাইনে এবং ‘আল্লাহ্‌’ এক লাইনে।১৫৯

আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম চাঁদির একটি আংটি তৈরী করান। তাতাঁর হাতে ছিল। অতঃপর আবু বকরও ওমর (রাঃ) এর হাতে ছিল। তারপর ওসমান (রাঃ) এর হাতে ছিল। অবশেষে তাঁর হাতে থাকাকালীন সেটি ‘আরসি’ কূপে পতিত হয়। তাতে অঙ্কিত ছিল ‘মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ’।১৬০

আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর, ইবনে আব্বাস ও আনাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম ডান হাতে আংটি ব্যবহার করতেন।১৬১

আনাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলে আংটি পরতেন।১৬২

এই হাদীছ দ্বারা বুঝা গেল যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বাম হাতেও আংটি পরতেন। আর এর উপরের সব হাদীছ দ্বারা বুঝা যায়, তিনি ডান হাতে আংটি পরতেন। উভয় বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় সাধন করার জন্য বলা যায় যে, যদিও তিনি প্রায়শঃ ডান হাতেই আংটি ব্যবহার করতেন কিন্তু কখনো কখনো বাম হাতেও পরেছেন। তাই কার্যক্ষেত্রে বাম হাতেও আংটি ব্যবহার করা যায়।১৬৩

সুরমা ব্যবহারঃ

জাবের (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা ঘুমানোর সময় অবশ্যই ইছমিদ সুরমা ব্যবহার করবে, কেননা তা চক্ষু পরিষ্কার ও উজ্জ্বল করে এবং চুল গজায়।১৬৪

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের সুরমার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হ’ল ‘ইছমিদ’ সুরমা’।১৬৫

আনাস (রাঃ) বলেন,  রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বেজোড় হিসাবে সূরমা ব্যবহার করতেন।১৬৬

আনাস (রাঃ) বলেন, ডান চোখে তিনবার এবং বাম চোখে দু’বার সুরমা ব্যবহার করতেন।১৬৭

আতর ও সুগন্ধি ব্যবহারঃ

আনাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো খুশবু ফিরিয়ে দিতেন না।১৬৮

আয়েশা (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম সুগন্ধিকে খুব ভালবাসতেন’।১৬৯

আনাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে একটি আতরদানি ছিল। যা থেকে তিনি সুগন্ধি ব্যবহার করতেন।১৭০

চলার ধরনঃ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে চলতেন, যাতে বুঝা যেত যে, তিনি অক্ষমও নন আবার অলসও নন।১৭১

জাবের (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম যখন পদচারনা করতেন, তখন পিছনে ফিরে তাকাতেন না।১৭২

আনাস (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম  যখন চলতেন, তখন সামনের দিকে ঝুকে চলতেন।১৭৩

জাবের (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম যখন চলতেন, তখন তাঁর ছাহাবীগণ সামনের দিকে থাকতেন। তাঁর পিছনের দিক ফেরেশতাদের জন্য ছেড়ে দেয়া হ’ত।১৭৪

তথ্যসূত্র :

১৪৩. তিরমিযী, সহীহুল জামে হা/৪৭৭৯।

১৪৪. মুসিলম, আবু দাউদ হা/৪০৭৬; ইবনু মাজাহ হা/৩২৮৫; দারিমী ২/৮৪; আখলাকুন নবী পৃ: ১১৬।

১৪৫. মুসলিম হা/১৩৫৯; ইবনু মাজাহ হা/৩৫৮৪।

১৪৬. তিরমিযী হা/১৭৩৬; শামায়েল হা/৯৪, সিলসিলাহ সহীহাহ হা/১৭৬।

১৪৭. আহমাদ ১/২৩৩ পৃ:; তিরমিযী, শামায়েল হা/৯৫।

১৪৮. আবু দাউদ হা/৪০২০; তিরমিযী হা/১৭৬৭; ইবনে হিব্বান হা/১৪৪২; আখলাকুন নবী, পৃ: ১০৩।

১৪৯. আবু দাউদ ৯/১৮৫; তিরমিযী ৪/৫৩২; নাসাঈ ৮/২৮৪; শায়খ ওয়াদেযী, আল জামিউস সহীহ ৪/২৯১ পৃ:।

১৫০. আবু দাউদ হা/১৫৫; তিরমিযী হা/২৮২১; ইবন মাজাহ হা/৩৬২।

১৫১. তিরমিযী হা/১৭৬৬; শামায়েল হা/৫৯।

১৫২. আবু দাউদ হা/৪১৩৩; তিরমিযী হা/১৭৭৩; শামায়েল হা/৬০।

১৫৩. ইবনু মাজাহ হা/৩৬১৪; ইবনু সা’দ ১/৪৭৮ পৃ: তিরমিযী, শামায়েল হা/৬১।

১৫৪. আবু দাউদ হা/১৭৭২; ইবনু সা’দ ১/৪৭৩; আখলাকুন নবী পৃ: ১৩৬; শামায়েল হা/৬৩।

১৫৫. আহমাদ ৪/৩০৭; ইবনু সা’দ ১/৪৭৯; আখলাকুন নবী পৃ: ১৩৫; শামায়েল হা/৬৫।

১৫৬. মুসলিম হা/২৬৮’ আবু দাউদ হা/৪১৪০; তিরমিযী হা/৬০৮।

১৫৭. মুসলিম হা/২০৯৪; ইবনু মাজাহ হা/৩৬৪১; আবু দাউদ হা/৪২১৬; তিরমিযী হা/১৭৩৭।

১৫৮. বুখারী হা/৬৫; মুসলিম হা/২০৭২; আবু দাউদ হা/৪২১৪।

১৫৯. মুসলিম হা/২০৯২; আবু দাউদ হা/৪২১৪; ইবনু সা’দ ১/৪৭৪ পৃ: আখলাকুন নাবী, পৃ: ১৩২।

১৬০. বুখারী হা/৫৪, আবু দাউদ হা/৪২১৮।

১৬১. আবু দাউদ হা/৪২২৬; তিরমিযী হা/১৭৭৪; আবু দাউদ হা/৪২২৯; শামায়েল হা/৭৭, ৭৮, ৮০ ও ৮৩।

১৬২. মুসলিম হা/২০৯৫; নাসাঈ ৮/১৯৪; আহমাদ ৩/২৬৭।

১৬৩. ফাতহুলবারী ১০/৪০২; মুখতাছার শামায়েল পৃ: ৬২।

১৬৪. আবু দাউদ হা/৩৮৭৮; ইবনু মাজাহ হা/৩৪৯৭; তিরমিযী হা/১৭৫৭।

১৬৫. নাসাঈ হা/৩৪৯৭; তিরমিযী হা/৪৪।

১৬৬. মুসনাদে বাযযার, সিলসিলা সহীহাহ হা/২৭৪৬।

১৬৭. ইবনে সা’দ ১/১৮৪; মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা ৮/৫৯৯; আখলাকুন নবী, পৃ: ১৮৩; সিলসিলা সহীহাহ হা/৬৩৩।

১৬৮. বুখারী হা/২৫৮২; তিরমিযী হা/২৭৮৯; আহমাদ ৩/১৩৩ পৃ:।

১৬৯. আবু দাউদ হা/৪১৬২; ইবনু সা’দ ১/৩৯৯; আখলাকুন নবী, পৃ: ৯৮; তিরমিযী শামায়েল হা/১৮৫।

১৭১. সহীহুল জামে আস-সাগীর হা/৫০১৬।

১৭২. সিলসিলা সহীহাহ হা/২০৮৬।

১৭৩. মুসলিম হা/১৫৬৯; দারেমী ১/৩১ পৃ: আহমাদ ৩/২২৮ পৃ:।

১৭৪. হাকেম, বায়হাক্বী, সহীহুল জামে আস-সাগীর হা/৪৭৮৭।

 

আগের পর্বের লিংক

শামায়েলে মুহাম্মাদী পর্ব ১

শামায়েলে মুহাম্মাদী পর্ব ২

শামায়েলে মুহাম্মাদী পর্ব ৩

শামায়েলে মুহাম্মাদী পর্ব ৪

মতামত দিন