নারীদের দ্বীনী শিক্ষার গুরুত্ব

নারীদের দ্বীনী শিক্ষার গুরুত্ব

লেখক: মুসাম্মাৎ আখতার বানু

অনুলিখন: ফিরোজ আহমেদ

মানব সমাজে শিক্ষা একটি গুর্বত্বপূর্ণ বিষয়। এমনকি জাতির মেরুদন্ড হচ্ছে শিক্ষা। সুতরাং কোন জাতি শিক্ষা ব্যতীত উন্নতি লাভ করতে পারে না। সভ্যতা ও সম্মানের প্রথম ধাপই হল শিক্ষা। হযরত মুহাম্মাদ (ছাঃ) এর প্রতি ওয়াহী’র প্রথম বাণী ছিল

إِقْـرَأْ بِاسْـمِ رَبِّـكَ الَّذِىْ خَلَقَ  ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন’ (আলাক্ব ১)।

ইসলামের পূর্বে গোটা দুনিয়া ছিল অন্যায়,অবিচার ও অশ্লীলতায় ভরপুর। কিন্তু ইতিহাসে সে যুগকে চরিত্রহীনতা ও কুকর্মের যুগ বলে আখ্যায়িত করা হয়নি;বরং বলা হয়েছে জাহেলিয়াত বা মূর্খতার যুগ। কাজেই বুঝা গেল সমস্ত অন্যায় ও চরিত্রহীনতার মূল হচ্ছে মূর্খতা। পক্ষান্তরে ইসলামের মূল নেয়ামত হচ্ছে শিক্ষা। সর্বপ্রথম হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করে আল্লাহ পাক তার শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। তিনি এরশাদ করেন, তিনি আদমকে শিক্ষা দিলেন সমস্ত কিছুর নাম,অতঃপর সেগুলি পেশ করলেন ফেরেশতাদের কাছে’(বাক্বারাহ ৩১)। অর্থাৎ আদম (আঃ) ও ফেরেশতাদের মধ্যে জ্ঞানের প্রতিযোগিতা হল। প্রতিযোগিতায় আদম (আঃ) বিজয়ী হলেন। তাঁর মাথায় পরানো হল খিলাফাতের মহামুকুট। তারপর আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,

وَ عَـلَّمَ اَدَمَ الْأَسْمَآءَ كُـلَّهَا ثُمَّ عَـرَضَـهُمْ عَلَى الْمَلاَئِـكَةِ”হে আদম! তুমি তোমার সঙ্গিনী সহ জান্নাতে বসবাস কর। (বাক্বারাহ ৩৫)।

এখানে প্রাণিধানযোগ্য যে,প্রথমে হয়েছে তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা এবং পরে হয়েছে জান্নাতে থাকার ব্যবস্থা। এ থেকে বুঝা গেল আল্লাহ তাআলার কাছে শিক্ষার মর্যাদা অগ্রগণ্য। শিক্ষা ব্যতীত মানুষ ও ইতর প্রাণীর মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই।

মুসলমান নারী-পুর্বষ প্রত্যেকের ইসলামী জ্ঞানার্জন আবশ্যক। কেননা পুরুষ কিংবা মহিলা উভয়ের ধর্মীয় সচেতনতা লাভ এবং আখলাক ও চরিত্রগত দিকের উন্নতি এবং ছোটদের সাথে স্নেহ বাৎসল্য ব্যবহার,বড়দের প্রতি আদব-ক্বায়দা ও সালাম সূচক আচরণ অবহিত হওয়া উভয়ের জন্য সমানভাবে বাঞ্ছনীয় ও একইরূপ কর্তব্য। বরং শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা মেয়েদের জন্য পুর্বষের চাইতে অধিক। কেননা ভবিষ্যত প্রজন্মের শিক্ষার হাতেখড়ি তাঁদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। তাই জাতির শিক্ষা একমাত্র মেয়েদের উপর নির্ভরশীল। মা যদি মূর্খ হয় তবে ভবিষ্যত প্রজন্মও বহুলাংশে মূর্খই হয়ে থাকে। অবশ্য কারো ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে অন্য কথা। মা যদি শিক্ষিত হন তবে তার সন্তানেরা শিক্ষিত ও আলিম হবে,একথা স্বাভাবিকভাবে বলা যায়। এজন্য ইসলামে সন্তান জন্মের সাথে সাথে শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে সর্বপ্রথম তার কানে আযান দেওয়ার নিয়ম রাখা হয়েছে। যাতে রয়েছে তাওহীদ,রিসালাত ও ইবাদাতের শিক্ষা। আযানের মাধ্যমে প্রতিটি মৌলিক বিষয়ের যেমনি শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে তেমনি “حَىَّ عَـلَى الْفَلاَح”অর্থাৎ কল্যাণের দিকে আসো” আহ্বানের মাধ্যমে শিক্ষার ফলাফলও জানিয়ে দেওয়া হয়। এ সকল বিষয়াবলী থেকে প্রতীয়মান হয় যে,ইসলামে শিক্ষার মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম।

আব্দুর রহমান খাঁন ছিলেন কাবুলের গভর্ণর। তার দ্বারা আমীর দোস্ত মুহাম্মাদে একটি ঘটনা নিম্নরূপঃ

কোন বৈরী শক্তি তার রাজ্যে আক্রমণ করলে তা প্রতিহত করার জন্য তিনি স্বীয় পুত্রের নেতৃত্বে এক সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। দুতিন দিন পর এমন খবর এলো যে,শাহাজাদার পরাজয় আসন্ন,সৈন্যদের নিয়ে তিনি পিছনে হটে আসছেন। আর শত্রুবাহিনী ধাওয়া করে তার পিছু পিছু আসছে। এ খবর শুনে আমীরের মন খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন,একে তো পরাজয়ের গ্লানি,দ্বিতীয়তঃ পুত্রের দূর্বলতা ও অক্ষমতার স্মৃতি এবং ৩য় হলো লোকজনের হেয় প্রতিপন্ন করার ভাবনা।

বাদশাহ ঘরে এসে তার স্ত্রীর কাছে সমস্ত ঘটনা শোনালেন। স্ত্রী বললেন,পুরা ঘটনাই অবাস্তব ও মিথ্যা। বাদশাহ বললেন,গুপ্তচরের রিপোর্ট কি করে তা মিথ্যা হতে পারে?কিন্তু বেগম ছাহেবা একেবারেই মানছেন না যে,তার ছেলে পরাজিত হয়েছে। একথা বিশ্বাসই করলেন না তিনি। বেগম ছাহেবার কথাকে অবজ্ঞা করে প্রাসাদ থেকে বের হয়ে গেলেন বাদশাহ। দ্বিতীয় দিন খবর পেলেন,ঐ খবর সত্যিই মিথ্যা ছিল। বাস্তব ঘটনা হলো তার পুত্র যুদ্ধে জয়লাভ করে ফিরছেন।

শুনে বেগম ছাহেবা আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করলেন। বাদশাহ বেগমকে জিজ্ঞেস করলেন যে,তুমি কিভাবে জানলে যে,শাহজাদার পরাজয় হয়নি?তোমার কাছে এমন কি প্রমাণ ছিল,যারা দ্বারা তুমি গোটা হুকূমতকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করেছো? বেগম বললেন,কিছুই না আল্লাহ তাআলা আমার ইয্‌যত রেখেছেন। এটা আমার একটা গোপন রহস্যের ব্যাপার। যা আমি প্রকাশ করতে চাই না। বহু পীড়াপীড়ির পর বেগম ছাহেবা বললেন- এ ছেলে যখন আমার গর্ভে আসে,তখন থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করেছি যে,আমার পেটে যেন সন্দেহযুক্ত কোন খাদ্য না যায়। কারণ হালাল খাদ্যের দ্বারা উত্তম চরিত্র তৈরী হয়;আর হারাম খাদ্যের দ্বারা চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। এ শাহজাদা আমার গর্ভে নয় মাস থাকা অবস্থায় খাদ্যের কোনো একটা দানাও আমি ভৰণ করিনি, যার হারাম হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ পর্যন্তও হতে পারে। এজন্য তার চরিত্র খারাপ হতে পারে তা কল্পনাও করা যায় না। সুতরাং এমন আখলাকের পরিচয় হলো-যুদ্ধে গেলে শাহাদাত বরণ।

অন্য দিকে যুদ্ধের মাঠ থেকে পিঠ দেখিয়ে আসা হলো অসৎ চরিত্রের লৰণ। এজন্য আমার বিশ্বাস ছিল শাহজাদা শহীদ হয়ে যেতে পারে কিন্তু ময়দান থেকে পলায়ণ করে আসবে না। শুধু তাই নয়;বরং এ শাহজাদার যখন জন্ম হয়,তখন থেকে অদ্যাবধি আমি কোন সন্দেহ যুক্ত বস্তু আহার করিনি, যাতে উক্ত হারাম খাদ্যবস্তু দ্বারা শরীরে দুগ্ধ সঞ্চার না হয় এবং এর প্রভাব শাহজাদার উপর না পড়ে। তাছাড়া যখন আমি তাকে দুধ পান করাতাম,তখন আমি উযূ করে দুই রাকআত সালাত পড়ে নিতাম,যেন শাহজাদার চরিত্র খুব ভালো হয়। এজন্য আমি আপনার হুকুমতের সকলের কথাকে মিথ্যা ও অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিতে কিছু মাত্র সংশায়ান্বিত হইনি এবং আমার বিশ্বাস থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হইনি।

প্রিয় বোন! আমীর দোস্ত মুহাম্মাদ এর স্ত্রী আরাম-আয়েশের মধ্যে থেকেও মুত্তাক্বী হতে পারলেন। অথচ আজকাল আমাদের মা বোনেরা সাধারণ পরিবারে থেকে পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারেন না কেন? মুত্তাক্বী হবার পথে এদের তো কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। অতএব আমাদেরকেও দ্বীনী শিক্ষার প্রতি গভীর মনোনিবেশ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন! আমীন!!!

সূত্র: পুরনো আত-তাহরীক

মতামত দিন