আক্বীদা

সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলা কি সৃষ্টি করেছেন?

ভূমিকাঃ المقدمة
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার এবং তাঁর সকল সাহাবীর উপর। ইসলাম যে কোন আমলের পূর্বে সঠিক আকীদাহ গ্রহণ করার উপর বিশেষ গুরত্ব প্রদান করেছে। তাই আকীদার বিষয়টি সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আকীদাহ সঠিক না হলে কারও কোন আমল আল্লাহর দরবারে গৃহিত হবে না। এই জন্যই ইসলাম আকীদাহ সংশোধনের উপর সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব প্রদান করেছে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে অনেক মুসলিমদের আকীদায় যথেষ্ট ভুল রয়েছে। মুসলিমদের বিরাট একটি অংশ বিশ্বাস করে যে, তিনি আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি, তিনি নূরের তৈরী, তিনি গায়েব জানতেন ইত্যাদি কুরআন ও সহীহ হাদীছ বিরোধী আরও অনেক আকীদাহ্ ও বিশ্বাস। আমরা এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে একটি ভুল আকীদাহ সংশোধনের চেষ্টা করব।
নবী (সাঃ) প্রথম সৃষ্টি হওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত হাদীছটির প্রকৃত অবস্থাঃ حالة الحديث المشهور بأن النبي صلى الله عليه وسلم أول المخلوقات
আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মাঝে এই কথাটি প্রচলিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম মুহাম্মাদ (সাঃ)এর নূর সৃষ্টি করেছেনে। এ ধরণের বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ার কারণ হল আমাদের দেশের বেশ কিছু বক্তা ও আলেম এ ব্যাপারে একটি মাওযু তথা বানোয়াট হাদীছ দিয়ে দলীল গ্রহণ করে থাকেন এবং সুমধুর কণ্ঠে ওয়াজ করে মানুষকে বুঝিয়ে থাকেন। অনেক বক্তার ওয়াজের একমাত্র পূঁজিই হচ্ছে এ জাতীয় কয়েকটি বানোয়াট বিষয়। যদিও কুরআন ও হাদীছের জ্ঞান তাদের কাছে খুবই নগণ্য। হাদীছটি মানুষের মুখে মুখে শুনা যায়, কিন্তু গ্রহণযোগ্য কোন হাদীছের কিতাবে তা পাওয়া যায় না। হাদীছটি হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
أول ما خلق الله تعالى نوري
অর্থাৎ আল্লাহ্ তাআলা সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন। অন্য শব্দে এসেছে,
أول ما خلق الله نور نبيك يا جابر
হে জাবের! সর্বপ্রথম আল্লাহ তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন। একই অর্থে এবং বিভিন্ন শব্দে সুফীদের কিতাবসমূহে সনদ বিহীন এই বানোয়াট হাদীছটি উল্লেখিত হয়েছে। মুসান্নাফে আব্দু রাজ্জাকে হাদীছটি থাকলেও লেখক কোন নির্ভরযোগ্য সনদ উল্লেখ করেন নি। এই মর্মে যত হাদীছ বর্ণিত হাদীছ তার সবই বাতিল।
মুহাদ্দিছগণ এই হাদীছকে মাওযু বলেছেন। ইমাম সুয়ুতী (রঃ) বলেনঃ এই হাদীছের কোন নির্ভরযোগ্য সনদ নেই। সুতরাং হাদীছটি মুনকার ও বানোয়াট। হাদীছের কোন কিতাবে এর ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। (দেখুনঃ হাভী ১/৩২৫) ইমাম সাগানীও হাদীছটিকে মাওযু বলেছেন। (দেখুনঃ الموضوعات للصغاني )
ইমাম আলবানী (রঃ) বলেনঃ এটি মানুষের মুখে মুখে প্রসিদ্ধ একটি বাতিল হাদীছ। (দেখুনঃ সিলসিলায়ে সাহীহা, হাদীছ নং- ৪৫৮)। সুফীদের অন্যতম গুরু ওয়াহদাতুল উজুদের প্রবক্তা ইবনে আরাবী এই আকীদাই পোষেণ করতেন। আশ্চর্যের বিষয় হল আমাদের দেশের বহু সুন্নী মুসলমানের আকীদাও তাই।
সর্বপ্রথম সৃষ্টি কোনটি? ما هو أول المخلوقات
সহীহ হাদীছের ভাষ্য থেকে জানা যায় যে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রথম সৃষ্টি ছিলেন না এবং তিনি নূরের তৈরীও ছিলেন না। সর্বপ্রথম সৃষ্টির ব্যাপারে আলেমগণ থেকে একাধিক কথা বর্ণিত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেনঃ কলমই প্রথম সৃষ্টি। প্রখ্যাত আলেম ইবনে জারীর, ইবনুল আরাবী এমতেরই সমর্থক ছিলেন। পরবর্তীদের মধ্যে ইমাম আলবানী (রঃ) এমতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তারা নিম্নের সহীহ হাদীছগুলো দিয়ে দলীল গ্রহণ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
إن أول شيء خلقه الله تعالى القلم ، وأمره أن يكتب كل شيء يكون
রাসূল (সাঃ) বলেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম যে জিনিষটি সৃষ্টি করেছেন, তা হচ্ছে কলম। তারপর কলমকে কিয়ামত পর্যন্ত যা হবে তা লিখতে বললেন। {(আবু ইয়ালা (১/১২৬) আল-আসমা ওয়াস সিফাত লিল-বায়হাকী ২৭১), সিলসিলায়ে সাহীহা, হাদীছ নং- ১৩৩)}

তিনি আরও বলেনঃ
إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ: لَهُ اكْتُبْ قَالَ: رَبِّ وَمَاذَا أَكْتُبُ قَالَ: اكْتُبْ مَقَادِيرَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ
“আল্লাহ্ তাআলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে তাকে বললেনঃ লিখ। কলম বললঃ হে আমার প্রতিপালক! কী লিখব? আল্লাহ্ বললেনঃ কিয়ামত পর্যন্ত আগমণকারী প্রতিটি বস্তুর তাকদীর লিখ”। (দেখুনঃ আবু দাউদ, তিরমিজী, বায়হাকী এবং অন্যান্য)
মালেকী মাজহাবের বিখ্যাত আলেম ইবনুল আরাবী বলেনঃ
قبل القلم لم يكن شيء إلا هو سبحانه
কলমের পূর্বে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। (দেখুন আরেযাতুল আহওয়াযী)
অপর পক্ষে আরেক দল আলেমের মতে সর্বপ্রথম সৃষ্টি হচ্ছে আরশ। আল্লামা ইবনে তাইমীয়া এবং অন্যান্য আলেম থেকে এধরণের মত পাওয়া যায়। তাদের দলীল হচ্ছে, ইমরান বিন হুসাইন থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
كَانَ اللَّهُ وَلَمْ يَكُنْ شَىْءٌ غَيْرُهُ ، وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ ، وَكَتَبَ فِى الذِّكْرِ كُلَّ شَىْءٍ ، وَخَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ
আদিতে একমাত্র আল্লাহ-ই ছিলেন। তিনি ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। তাঁর আরশ ছিল পানির উপর। তারপর তিনি প্রত্যেক জিনিষ লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ করলেন এবং তিনি আসমান ও যমিন সৃষ্টি করলেন। (বুখারী, হাদীছ নং- ৩১৯১)
উপরের হাদীছ থেকেই দলীল গ্রহণ করে আবার কেউ কেউ পানি সর্বপ্রথম সৃষ্টি বলে মত প্রকাশ করেছেন।
প্রথম পর্যায়ের কতিপয় মাখলুক বা সৃষ্টিঃ بعض الأمثلة من أوائل المخلوقات

এ কথা সত্য যে, আরশ, কুরসী, লাওহে মাহফুয, পানি, আসমান, ফেরেশতা, জিন ইত্যাদি প্রথম পর্যায়ের সৃষ্টির অন্তর্ভূক্ত। মানুষ কোন ক্রমেই উপরোক্ত সৃষ্টিসমূহের পূর্বে সৃষ্টি হয় নি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও নন। কলমও প্রথম পর্যায়ের সৃষ্টি। তবে আমরা যে কলম দিয়ে লেখি সেই কলম সর্বপ্রথম সৃষ্টি নয়; বরং যে কলম দিয়ে লাওহে মাহফুয লেখা হয়েছে সেটিই সর্বপ্রথম সৃষ্টি।
সুতরাং সর্বপ্রথম সৃষ্টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হওয়ার ব্যাপারে কোন সহীহ দলীল না থাকায় তা মুসলিমের আকীদাহ হতে পারে না। তাই উপরোক্ত হাদীছগুলো এবং অন্যান্য সহীহ হাদীছের শিক্ষা গ্রহণ করা জরুরী।
ইমাম মালেক (রঃ) বলেনঃ
ما منا من أحد إلا يؤخذ من قوله أو يرد عليه إلا صاحب هذا القبر ويشير إلى قبر النبي صلى الله عليه وسلم
আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার সকল কথাই গ্রহণ করা হেব অর্থাৎ আমাদের কারও কথা গ্রহণ করা যেতে পারে আবার প্রত্যাখ্যানও করা যেতে পারে। তবে এই কবরের অধিবাসী ব্যতীত। এই কথা বলে তিনি নবী (সাঃ)এর কবরের দিকে ইঙ্গিত করে দেখালেন।
উপসংহারঃ الختام
উপরোক্ত আলোচনার আলোকে সহীহ হাদীছ দ্বারা সুস্পষ্ট রূপে প্রমাণিত হল যে, নবী (সাঃ) সর্বপ্রথম সৃষ্টি নন। সুতরাং সহীহ হাদীছ দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর কোন মুসলিমের আকীদাহ এটি হতে পারে না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি। আল্লাহ আমাদেরকে দ্বীনের সকল সঠিক আকীদাহ গ্রহণ করার তাওফীক দিন। আমীন

মতামত দিন