প্রবন্ধ

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা

মুহাম্মদ শাহিদুল ইসলাম

সহকারী অধ্যাপক

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

মানুষ তার শৈশবকাল থেকে কথা বলতে শিখলেও তার ভাষা শুদ্ধ হবে, এমন কাথা ঠিক নয়। কোন ভাষায় শুদ্ধ, প্রাঞ্জল ও সাবলীলভাবে কথা বলতে হলে, সাহিত্য তৈরী করতে হলে সে ভাষা চর্চা করতে হবে। এ জন্য পড়তে হবে, বিশেষ বিশেষ বক্তব্য আত্মস্থ করতে হবে, আবৃত্তি করতে হবে, ভাষাশৈলীর রহস্য জানতে হবে, অনুসরণ করতে হবে। তা হলেই একজন মানুষ বাগ্মী ও পরিশীলিত বক্তব্যের অধিকারী হতে পারে। ইসলাম মানুষের ভাষাকে বিভিন্নভাবে মর্যাদা ও গুরুত্ব দিয়েছে। আর তা হলো, মানুষ জন্মলগ্ন থেকে যে ভাষায় কথা বলে, বড় হয়ে উঠে, সে ভাষায় কথা বলার অধিকার তার জন্মগত অধিকার ও সহজাত প্রবৃত্তি। ফলে এটা তার অস্থিমজ্জা, রক্ত মাংসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হয়ে যায়। তাই ইসলাম মানুসের এ অধিকার কেড়ে নেয় না। মায়ের প্রতি একটি সন্তানের আকর্ষণ যেমন স্বাভাবিক, কারো মাতৃভাষার প্রতি আকর্ষণও তেমনি স্বাভাবিক স্বভাব ধর্ম ইসলাম মানুষের  এ স্বাভাবিক আকর্ষন সহজেই স্বীকার করে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্‌ বলেন :

فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ.

“অতএব (হে নবী), তুমি নিষ্ঠার সাথে নিজেকে সঠিক দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখো, আল্লাহ্‌ তা‘আলার প্রকৃতির ওপর (নিজেকে দাঁড় করাও), যার ওপর তিনি মনুষকে পয়দা করেছে; (মনে রেখো) আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে কোনো রদবদল নেই; এ হচ্ছে সহজ জীবনবিধান, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।”[1]

আল্লাহ্‌ তা‘আলা মানুষের মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিতে যেয়ে তাঁর প্রেরিত প্রত্যেক নবীকে স্বজাতির ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন এবং এ ভাষাতেই কিতাবাদি নাযিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন :

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ فَيُضِلُّ اللَّهُ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ.

“আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য, আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আর এ কারণেই আল-কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে।

ইসলাম মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব অবৈধ মনে করে না বরং বর্ণিত আছে, রাসূল সা. মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের ভাষায় কথা বলতে গর্ববোধ করতেন। তিনি বলতেন : আরবদের মধ্যে আমার ভাষা সর্বাধিক সুফলিত। তোমাদের চাইতেও আমার ভাষা অধিকতর মার্জিত ও সুফলিত।

এর কারণ তিনি নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, আরবের সবচেয়ে মার্জিত ভাষার অধিকারী সাদিয়া গোত্রে আমি মানুষ হয়েছি। তাদেরই কোলে আমার মুখ ফুটেছে। তাই আমি সর্বাধিক সুফলিত ভাষা ব্যক্ত করেছি।

কাজেই মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব করা যায়। সকলেই মাতৃভাষা চর্চার, একে উন্নত করার অধিকার রয়েছে এবং এ লক্ষ্যে কাজ করা কর্তব্যও বটে। মূল আরবী ভাষা এক হলেও আরবদের গোত্রভেদে উচ্চারণ ও পঠনরীতির মাঝে কিছুটা পার্থক্য আছে। যাকে কেন্দ্র করে একই অর্থের বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয় যাকে আরবী পরিভাষায় মুরাদিফাত বলে।

যাহোক, আল-কুরআন মূলত ভাষা ও উচ্চারণ রীতিকে প্রাধান্য দিয়েই অবতীর্ণ হয়। কিন্তু ইসলাম ভাষাগত আঞ্চলিকতা তথা মাতৃভাষা প্রতি এতই গুরুত্ব দিয়েছে যে, আল-কুরআন আরবের বিভিন্ন পঠনরীতিতে পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ জন্য কুরআন পাঠ সাত ক্বিরআত (পঠনরীতি) প্রচলিত আছে। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে,

قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : إن القرآن أنزل على سبعة حروف فاقرؤوا ما تيسر منه.

রাসূল সা. বলেছেন : নিশ্চয়ই কুরআন সাত হরফে বা উপভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব, এসকল ভাষার মধ্যে যে ভাষাটি (তোমাদের কাছে) সহজ হয়, সেভাষাতেই তোমরা তা পাঠ কর।

উভয়টি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণের অন্যতম উৎস। কেননা, মাতৃভাষা মানুষের পবিত্র এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবলম্বন| এ ভাষার মধ্যে মানুষ অংকুরিত হয়। এ ভাষার মধ্যে মানুষ সর্বদা প্রবাহিত থাকে। এ ভাষায় তাদের অস্তিত্ব সাক্ষরিত হয়।

ভাষা বিকৃতি করাও ইসলাম সমর্থন করে ন। কারণ, আহলে কিতাবগণ বিকৃত উচ্চারণ ও মুখ বাঁকিয়ে গ্রন্থ পাঠ করে ভাষাগত জটিলতা সৃষ্টি করত এবং তাদের অনুসারীদের ধোঁকা দিত। আল্লাহ্‌ তা‘আলা তাদের এ ভাষাগত বিকৃতি পছন্দ করেননি। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্‌ বলেন :

وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقًا يَلْوُونَ أَلْسِنَتَهُمْ بِالْكِتَابِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ الْكِتَابِ وَمَا هُوَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ.

আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর, তারা কিতাব থেকেই পাঠ করছে, অথচ তারা যা পাঠ করছে তা আদৌ কিতাব নয় এবং তারা বলে : এসব কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল কৃত অথচ এসব আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নয়। তারা বলে : এটি আল্লাহর কথা, অথচ আল্লাহর কথা নয়; আর তারা জেনে শুনে আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে।

অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন : কোন কোন ইয়াহুদী তার লক্ষ্য থেকে কথার মোড় ঘুরিয়ে নেয় এবং বলে : আমরা শুনেছি কিন্তু অমান্য করছি। তারা আরো বলে : শোন না শোনার মত, মুখ বাঁকিয়ে দ্বীনের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শণের উদ্দেশ্যে বলে ‘রায়িনা’ (আমাদের রাখাল), অথচ যদি তারা বলত : আমরা শুনেছি ও মান্য করেছি (এবং যদি বলত), শোন এবং আমাদের প্রতি লক্ষ্য রাখ, তবে সেই ছিল তাদের জন্য উত্তম, আর সেটাই ছিল যথার্থ ও সঠিক। কিন্তু আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন তাদের কুফরীর ধরণ। অতএব, তারা ঈমান আনছে না, কিন্তু অতি অল্প সংখ্যক ঈমান এনেছে।

অতএব উচ্চারণ বিকৃতি তথা ভাষা বিকৃতি ইসলামে নিষিদ্ধ। এ জন্য দেখা যায়, মূসা (আ) স্বীয় ভাষায় উচ্চারণ বিকৃতি থেকে রক্ষা পাওয়ার নিমিত্তে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন : আর আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।

কাজেই ভাষার বিকৃতি পরিত্যাজ্য। কারণ, ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চারণ বিকৃতি করতে করতে এক সময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তখন মানুষ তার কথা শুনতে পছন্দ করে না। সুতরাং উচ্চারণ বিকৃতি বৈধ নয়; বরং ভাষার মাধূর্য বৃদ্ধির জন্য সকলের আল্লাহর কাছে দুআ করা উচিত।



[1].  আল-কুরআন, সূরা আর-রুম, আয়াত নং-৩০

মতামত দিন