ইসলামের ইতিহাস

ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়্যা (রা)

 সুমায়্যা বিন্‌ত খুব্‌বাত (রা.)

লেখক : মুহাম্মাদ আবদুল মা’বুদ

 অনুলিখন : মুহাম্মাদ আলীমুদ্দীন

ইসলামের প্রথম শহীদ হযরত সুমায়্যা (রা) একজন মহিলা সাহাবী। তাঁর বংশ পরিচয় তেমন একটা পাওয়া যায় না। ইবন সা’দ তাঁর পিতার নাম ‘খুব্‌বাত’ বলেছেন, কিন্তু বালাজুরী বলেছেন ‘খায়্যাত’।প্রখ্যাত শহীদ সাহাবী ‘আম্মার ইবন ইয়াসিরের (রা.) মা এবং মক্কার আবু হুজাইফা ইবন আল-মুগীরা আল-মাখযুমীর দাসী।

Biography of Sumaiya Bangla

আল-ওয়াকিদীসহ একদল বংশবিদ্যা বিশারদ বলেছেন, হযরত ‘আম্মারের (রা.) পিতা ইয়াসির ইয়ামনের মাজহাজ গোত্রের ‘আনসী শাখার সন্তান। তবে তাঁর ছেলে আম্মার মক্কার বানু মাখযুমের আযাদকৃত দাস। ইয়াসির তাঁর দু’ভাই- আল হারিস ও মালিককে সংগে নিয়ে তাঁদের নিখোঁজ চতুর্থ, ভাইয়ের সন্ধানে মক্কা আসেন। আল-হারিস ও মালিক স্বদেশে ফিরে গেলেন, কিন্তু ইয়াসির মক্কায় থেকে যান। মক্কার রীতি অনুযায়ী তিনি আবু হুজাইফা ইবন আল-মুগীরা আল-মাখযুমীর সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে থাকেন। আবু হুজাইফা তাঁর দাসী সুমায়্যাকে ইয়াসিরের সাথে বিয়ে দেন এবং তাঁদের ছেলে ‘আম্মারের জন্ম হয়।। আবু হুজাইফা ‘আম্মারকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে নিজের সাথে রেখে দেন। যতদিন আবু হুজাইফা জীবিত ছিলেন ‘আম্মার তাঁর সাথেই ছিলেন। উল্লেখ্য যে, এই আবু হুজাইফা ছিলেন নরাধম আবু জাহলের চাচা।

হযরত সুমায়্যা (রা) যখন বার্ধক্যে দুর্বল হয়ে পড়েছেন তখন মক্কায় ইসলামী মক্কায় ইসলামী দা’ওয়াতের সূচনা হয়। তিনি প্রথম ভাগেই স্বামী ইয়াসির ও ছেলে ‘আম্মার সহ গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন। মক্কায় তাঁদের এমন কোন আত্নীয়- বন্ধু ছিল না যারা তাঁদেরকে কুরাইশদের নিষ্ঠুরতার হাত থেকে বাঁচাতে পারতো । আর তাই তারা তাঁদের উপর মাত্রা ছাড়া নির্যাতন চালাতে কোন রকম ত্রুটি করেনি।

ইমাম আহমাদ ও ইবন মাজাহ্‌ বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেনঃ সর্বপ্রথম যাঁরা ঘোষণা দান করেন, তাঁরা হলেন সাত জন। রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর, ‘আম্মার, আম্মারের মা- সুমায়্যা, সুহাইব, বিলাল ও আল-মিকদাদ (রা) আল্লাহ আ’আলা রাসূলুল্লাহকে (সা) তাঁর চাচার দ্বারা এবং আবু বকরকে তাঁর গোত্রের দ্বারা নিরাপত্তা বিধান করেন। আর অন্যদেরকে পৌত্তলিকতা লোহার বর্ম পরিয়ে প্রচণ্ড রোদে দাঁড় করিয়ে রাখতো।

 

হযরত জাবির (রা) বলেন, একদিন মুশরিকরা যখন ‘আম্মার ও তাঁর পরিবারবর্গকে শাস্তি দিচ্ছিল তখন সেই পথ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি তাঁদের অবস্থা দেখে বলেনঃ

‘হে ইয়াসিরের পরিবার পরিজন! তোমাদের জন্য সুসংবাদ। তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি ।’

 

আবদুল্লাহ ইবন জা’ফার (রা) বলেন, রাসূল (সা) তাঁদের সেই অসহায় অবস্থায় দেখে বলেনঃ

‘হে ইয়াসিরের পরিবারবর্গ ধৈর্য ধর, হে ইয়াসিরের পরিবারবর্গ ধৈর্য ধর। তোমাদের জন্য জান্নাত নির্ধারিত রয়েছে’। ইবন ‘আব্বাসের (রা) বর্ণনায় একথাও এসেছে যে, সুমায়্যাকে (রা) আবু জাহল বল্লম মেরে হত্যা করে। অত্যাচার, উৎপীড়নে ইয়াসিরের মৃত্যু হয় এবং ‘আবদুল্লাহ ইবন ইয়াসিরকে তীরবিদ্ধ করা হয় এবং তাতেই তিনি মারা যান।

‘উসমান (রা) বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে ‘আল-বাতহা’ উপত্যকায় হাঁটছিলাম। তখন দেখতে পেলাম, ‘আম্মার ও তাঁর পিতা-মাতার উপর উত্তপ্ত রোদে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আম্মারের পিতা রাসূলকে (সা) দেখে ওঠেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! কালচক্র এ রকম? রাসূল (সা) বললেনঃ হে ইয়াসিরের পরিবার-পরিজন ! ধৈর্য ধর। হে আল্লাহ ইয়াসিরের পরিবারবর্গকে ক্ষমা করুন।

সারাদিন এভাবে শাস্তি ভোগ করার পর সন্ধ্যায় তাঁরা মুক্তি পেতেন। শাস্তি ভোগ করে হযরত সুমায়্যা প্রতিদিনের মত একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেন। পাষণ্ড আবু জাহল তাঁকে অশালীন ভাষায় গাল দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তার পশুত্বের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়। সে সুমায়্যার দিকে বর্শা ছুড়ে মারে এবং সেটি তাঁর যৌনাঙ্গে গিয়ে বিদ্ধ হয় এবং তাতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।১০ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

মায়ের এমন অসহায় অবস্থায় মৃত্যু বরণে ছেলে ‘আম্মারের দুঃখের অন্ত ছিল না । তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ ! এখন তো জুলুম-অত্যাচার মাত্রা ছাড়া রূপ নিয়েছে। রাসূল (সা) তাঁকে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিলেন। তারপর বললেনঃ ‘হে আল্লাহ, তুমি ইয়াসিরের পরিবারের কাউকে জাহান্নামের আগুনের শাস্তি দিওনা ।’১১

হযরত সুমায়্যার (রা) শাহাদাতের ঘটনাটি হিজরাতের পূর্বের। এ কারণে তিনি হলেন ইসলামের প্রথম শহীদ। হযরত মুজাহিদ (রহ) বলেনঃ ইসলামের প্রথম শহীদ হলেন ‘আম্মারের মা সুমায়্যা ।১২

বদর যুদ্ধে নরাধম আবু জাহল নিহত হলে রাসূল (সা) আম্মারকে বললেনঃ

‘আল্লাহ তোমার মায়ের ঘাতককে হত্যা করেছেন ।’১৩

হযরত সুমায়্যার (রা) শাহাদাতের ঘটনাটি ঘটে ৬১৫ খ্রীস্টাব্দে ।১৪

 

তথ্যসূত্র

১.         তাবাকাত–৮/২৬৮

২.         আনসাবুল আশরাফ-১/১৫৭

৩.         তাবাকাত–৮/২৬৮

৪.         সীরাত ইবন হিশাম-১/২৬১; টীকা -৪; আনসাবুল আশরাফ-১/১৫৭

৫.         আল–আ’লাম -৩/১৪০

৬.         আল-বিদায়া–৩/২৮; কান্‌য আল উম্মাল–৭/১৪; আল ইসাবা–৪/৩৩৫; হায়াতুস সাহাবা-১/২৮৮

৭.         হায়াতুস সাহাবা-১/২৯১

৮.         সীরাত ইবন হিশাম-১/৩২০; আনসাবুল আশরাফ-১/১৬০, হায়াতুস সাহাবা-১/২৯১

৯.         তাবাকাত-৩/১৭৭; কান্‌য আল-‘উম্মাল-৭/৭২

১০.       তাবাকাত-৮/২৬৫; আল-বিদায়া-৩/৫৯; সিফাতুল সাফওয়া-২/৩২

১১.       সীরাত ইবন হিশাম-১/৩১৯; টীকা-৫

১২.       তাবাকাত-৮/২৬৫; আল-বিদায়া-৩/৫৯; সিফাতুস সাফওয়া-২/৩২

১৩.       আল-ইসাবা-৪/৩৩৫

১৪.       আল-আ‘লাম-৩/১৪০

 

লেখাটির মূল পিডিএফ ডাউনলোড করে পড়তে চাইলে ক্লিক করুন।

মতামত দিন