সিয়াম

রমযান মাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিশেষ আমল (পর্ব-২)

রমযান মাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিশেষ আমল (পর্ব-২) 

প্রথম পর্ব এখানে

মুহাম্মদ শাহিদুল ইসলাম

সহকারী অধ্যাপক

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

১৯. রাত্রে তারাবীহ-এর নামায পড়া : সালাতুত তারাবীহ পড়া এ মাসের অন্যতম আমল। তারাবীহ পড়ার সময় তার হক আদায় করতে হবে। হাদীসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমযানে কিয়ামু রমযান (সালাতুত তারাবীহ) আদায় করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’[1]

২০. বেশি বেশি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা : রমযান মাস হলো নেকী অর্জন করার একটি সর্বোত্তম মাধ্যম। আর এর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বেশি বেশি করে আল্লাহ্‌ তা‘আলার জিকির করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন :

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ.

‘‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আজাব বড় কঠিন’।’[2]

২১. কল্যাণকর কাজ বেশি বেশি করা : এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘‘এ মাসের প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে আহবান করতে থাকে যে, হে কল্যাণের অনুসন্ধানকারী তুমি আরো অগ্রসর হও! হে অসৎ কাজের পথিক, তোমরা অন্যায়  পথে চলা বন্ধ কর। (তুমি কি জান?) এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তায়ালা কত লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।’’[3]

২২. তাহাজ্জুদের নামায আদায় করা : রমাযান মাসে সাহরী খাওয়ার জন্য ভোর রাত্রে ঘুম থেকে উঠতে হয়। তাই সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করার বিশেষ সুযোগও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘‘ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হল রাতের সালাত অর্থাৎ তাহাজ্জুদের সালাত।’’[4]

২৩. বেশি বেশি দান-সদাকাহ করা : এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু  আনহু থেকে বর্ণিত, ‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল আর রমযানে তাঁর এ দানশীলতা আরো বেড়ে যেত।’’[5]

২৪. উত্তম চরিত্র গঠনের অনুশীলন করা : রমযান মাস নিজকে গঠনের মাস। এ মাসে এমন প্রশিক্ষণ নিতে হবে যার মাধ্যমে বাকি মাসগুলো এভাবেই পরিচালিত হয়। কাজেই এ সময় আমাদেরকে সুন্দর চরিত্র গঠনের অনুশীলন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রোযা রাখে, সে যেন তখন অশস্নীল কাজ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। রোযা রাখা অবস্থায় কেউ যদি তার সাথে গালাগালি ও মারামারি করতে আসে সে যেন বলে, আমি রোযাদার।’’[6]

২৫. ইসলামের দাওয়াতী কাজ করা : রমযান মাস হচ্ছে দ্বীনের দাওয়াতের সর্বোত্তম মাস। আর মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকাও উত্তম কাজ। এজন্য এ মাসে মানুষকে দ্বীনের পথে নিয়ে আসার জন্য আলোচনা করা, কুরআন ও হাদীসের দারস প্রদান, বই বিতরণ, কুরআন বিতরণ ইত্যাদি কাজ বেশি বেশি করা। আলকুরআনের ঘোষণা :

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ .

‘‘ঐ ব্যক্তির চাইতে উত্তম কথা আর কার হতে পারে যে আল্লাহর দিকে ডাকলো, নেক আমল করলো এবং ঘোষণা করলো, আমি একজন মুসলিম।’’[7]

২৬. উমরাহ পালন করা : এ মাসে একটি উমরা করলে একটি হাজ্জ আদায়ের সমান সাওয়াব হয়। তাই সামর্থ্য থাকলে এ মাসে উমরাহ আদায় করা উচিত। এ প্রসেঙ্গ আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘‘রমযান মাসে উমরা করা আমার সাথে হাজ্জ আদায় করার সমতুল্য।’’[8]

২৭. লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করা : রমযান মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল-কুরআনের ঘোষণা,

تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ  .

‘‘কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’’[9]

হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াব পাওয়ার আশায় ইবাদাত করবে তাকে পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’’[10]

২৮. বেশি বেশি দুআ ও কান্নাকাটি করা : দু‘আ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। এজন্য এ মাসে বেশি বেশি দু‘আ করা ও আল্লাহর নিকট বেশি বেশি কান্নাকাটি করা। হাদীসে এসেছে, ‘ইফতারের মূহূর্তে আল্লাহ রাববুল আলামীন বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। মুক্তির এ প্রক্রিয়াটি রমযানের প্রতি রাতেই চলতে থাকে।’’[11]

২৯. ইফতার করা : সূর্য অস্ত যাওয়ামাত্র ইফতার করা অর্থাৎ তাড়াতাড়ি ইফতার করা। অতিরঞ্জিত সাবধানতার নামে ইফতার বিলম্ব না করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

 لا يزال الناس بخير ما عجلوا الفطر.

“মানুষ যতদিন পর্যন্ত তাড়াতাড়ি ইফতার করবে ততদিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে।[12]

৩০. অন্য রোযাদারকে সামর্থ্যানুযায়ী ইফতার করানো : রোযাদারকে ইফতার করানোর মধ্যে একটি বিরাট সাওয়াব বিদ্যমান রয়েছে। প্রতিদিন কমপক্ষে একজনকে ইফতার করানোর চেষ্টা করা দরকার। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, ‘‘যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করবে, তাদের উভয়ের সাওয়াব হতে বিন্দুমাত্র  হ্রাস করা হবে না।।’’[13]

৩১. তাওবাহ করা : রমযান মাস তাওবাহ করার উত্তম সময়। আর তাওবাহ করলে আল্লাহ খুশী হন। আল-কুরআনে এসেছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ .

‘‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর, খাটি তাওবা; আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।’[14]

৩২. তাকওয়া অর্জন করা : তাকওয়া এমন একটি গুণ, যা বান্দাহকে আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় পাপকাজ থেকে বিরত রাখে এবং তাঁর আদেশ মানতে বাধ্য করে। আর রমযান মাস তাকওয়া নামক গুণটি অর্জন করার এক বিশেষ মৌসুম। এক আয়াতে আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন :

وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا  .

“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন।”[15]

৩৩. ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মাসজিদে অবস্থান করা : ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মাসজিদে অবস্থান করা। এটি একটি বিরাট সাওয়াবের কাজ। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ফজর জামাআত আদায় করার পর সূর্য উদয় পর্যন্ত মাসজিদে অবস্থান করবে, অতঃপর দুই রাকাআত সালাত আদায় করবে, সে পরিপূর্ণ হাজ্জ ও উমারাহ করার প্রতিদান পাবে।[16]

৩৪. ফিতরা দেয়া : এ মাসে রোযার ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণার্থে ফিতরাহ দেয়া আবশ্যক। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের সালাত আদায়ের পুর্বে ফিতরাহ আদায় করার আদেশ দিলেন।[17]

৩৫. অপরকে খাদ্য খাওয়ানো : রমযান মাসে লোকদের খাওয়ানো, বিশেষ করে রোযা পালনকারী গরীব, অসহায়কে খাদ্য খাওয়ানো বিরাট সাওয়াবের কাজ । কুরআনে এসেছে,

وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا  .

“যারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে।”[18]

৩৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক উন্নীত করা : আত্মীয়তার সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর তা রক্ষা করাও একটি ইবাদাত। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا .

‘‘আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চাও। আরও তাকওয়া Aej¤^b কর রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।[19]

৩৭. কুরআন মুখস্থ বা হিফয করা : কুরআন হিফয করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা নিজেই কুরআন হিফযের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি এ দায়িত্ব মূলত বান্দাদেরকে কুরআন হিফয করানোর মাধ্যমেই সম্পাদন করেন। কুরআনে এসেছে,

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ .

‘‘নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি, আর আমিই তার হিফাযতকারী।’’[20]

যে যত বেশি অংশ হিফয করতে পারবে তা তার জন্য ততই উত্তম। আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ্‌‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : ‘‘কুরআনের ধারক-বাহককে বলা হবে কুরআন পড়ে যাও, আর উপরে উঠতে থাক, ধীর-স্থিরভাবে তারতীলের সাথে পাঠ কর, যেমন দুনিয়াতে তারতীলের সাথে পাঠ করতে। কেননা জান্নাতে তোমার অবস্থান সেখানেই হবে, যেখানে তোমার আয়াত পড়া শেষ হবে।”[21]

প্রথম পর্ব পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

তথ্যসূত্র:


  1. বুখারী, আবু ‘আব্দিল্লাহ্‌ ইসমাঈল ইব্‌ন মুগীরাহ, আল-জামি‘উস সহীহ, (বৈরূত : দারু ইব্‌ন কাছীর, ১৪০৭হি.), প্রাগুক্ত, হাদীস নং-২০০৯
  2. . সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ৭
  3. . তিরমিযী, আবূ ঈসা মুহাম্মদ ইব্‌ন ঈসা, আস-সুনান, (বৈরূত : দারু ইহইয়াইত তুরাছিল ‘আরাবী), হাদীস নং-৬৮৪
  4. . মুসলিম, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-২৮১২
  5. . বুখারী, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-১৯০২
  6. . মুসলিম, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-১১৫১
  7. . সূরা হা-মীম সাজদাহ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৩৩
  8. . বুখারী, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-১৮৬৩
  9. . সূরা কদর, আয়াত : ৪
  10. . বুখারী, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৩৫
  11. . আল জামিউস সাগীর, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৩৯৩৩
  12. . বুখারী, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, ১৯৫৭; মুসলিম, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, ১০৯৮
  13. . ইব্‌ন মাজাহ, আবূ ‘আব্দিল্লাহ মুহাম্মদ ইব্‌ন ইয়াজিদ, আস-সুনান, (বৈরূত : দারুল ফিকর, তা.বি.),হাদীস নং-১৭৪৬
  14. . সূরা আত-তাহরীম, আয়াত : ৮
  15. . সূরা তালাক, আয়াত : ০২
  16. . আত-তিরমিযী, আস-সুনান, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৫৮৬
  17. . বুখারী, আস-সহীহ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-১৫০৩
  18. . সূরা আদ-দাহর, আয়াত : ৮
  19. . সূরা আন-নিসা, আয়াত : ১
  20. . সূরা আল-হিজর, আয়াত : ৯
  21. . আত-তিরমিযী, আস-সুনান প্রাগুক্ত, হাদীস নং-২৯১৪

মতামত দিন