সিয়াম

সিয়ামের আদব, করণীয় ও বর্জণীয় (পর্ব: ৮)

আজকের পর্ব

মুসাফির ও অসুস্থ ব্যক্তিদের সওম প্রসঙ্গে
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“আর যে অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে তবে অন্যান্য দিবসে সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না”। [সূরা বাকারা: (১৮৫)]
অসুস্থতা দু’প্রকার:
এক. যদি অসুস্থতা এমন হয় যে, যা থেকে সুস্থ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই যেমন ক্যান্সার, তাহলে এরূপ রোগীর উপর সওম জরুরী নয়। কারণ তার ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক যে, সে কখনো সওম পালনে সক্ষম হবে না, তাই সে প্রত্যেক সওমের পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাদ্য দেবে। সওমের সংখ্যানুপাতে মিসকিনদের জমা করে দুপুর অথবা রাতের খাবার দেবে, যেমন আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বার্ধক্যে করতেন। অথবা সওমের সংখ্যা হিসেবে মিসকিনদের পৃথক পৃথক খাদ্য দেবে। প্রত্যেক মিসকিনকে হাফ কিলু দশ গ্রাম গম/চাল দেবে। এর সাথে তরকারী হিসেবে গোস্ত অথবা তেল দেয়া ভাল। সওম পালনে বৃদ্ধ অক্ষম ব্যক্তিও অনুরূপ করবে।
দুই. সাময়িক অসুস্থতা, যা থেকে আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা বেশী যেমন জ্বর ও অনুরূপ অসুস্থতা। এর তিন অবস্থা:
প্রথম অবস্থা: সওম যদি তার জন্য ক্ষতিকর ও কষ্টকর না হয়, তাহলে তার উপর সওম ওয়াজিব, যেহেতু তার কোন ওজর নেই।
দ্বিতীয় অবস্থা: সওম তার জন্য কষ্টকর, কিন্তু ক্ষতিকর নয়, এমতাবস্থায় তার জন্য সওম মাকরুহ, কারণ এতে আল্লাহর রোখসত ত্যাগ করে নিজের উপর কষ্টের বোঝা চাপানো বৈ কিছু নয়।
তৃতীয় অবস্থা: সওম যদি ক্ষতিকর হয়, তাহলে তার জন্য সওম হারাম। কারণ এর ফলে নিজের উপর বিপদ ডেকে আনা বৈ কিছু নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“আর তোমরা নিজেরা নিজদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু”। সূরা নিসা: (২৯)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:

“এবং নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না”। সূরা বাকারা: (১৯৫)
হাদিসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না, এবং ক্ষতিগ্রস্ত করাও যাবে না”।[সুনানে ইবন মাজাহ: (২৩৪১), মুসনাদে আহমদ: (৫/৩২৭), মুসতাদরাকে হাকেম: (২৩৪৫), হাকেম হাদিসটি মুসলিমের শর্ত মোতাবেক সহিহ বলেছেন, এবং ইমাম যাহাবি তার সমর্থন করেছেন।]
ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: এ হাদিসের কয়েকটি সনদ রয়েছে, যার একটি অপরটি দ্বারা শক্তিশালী হয়।
রোগীর উপর সওম ক্ষতিকর কি-না তা রোগীর অনুভূতি অথবা নির্ভর যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ থেকে বুঝা যাবে। এ অবস্থায় যদি রোগী সওম ভঙ্গ করে, তাহলে সুস্থ হওয়ার পর অনুরূপ সংখ্যা ক্বাযা করবে। আর যদি সুস্থ হওয়ার পূর্বে মারা যায়, তাহলে মৃত্যুর কারণে তার থেকে সওম মওকুফ হয়ে যাবে। কারণ তার উপর পরবর্তীতে যে দিনে সওম ফরয ছিল, সে দিনগুলো সে পায়নি।
আর মুসাফির দু’প্রকার:
এক. যদি কেউ রমযানের সওম না রাখার জন্য বাহানা হিসেবে সফর আরম্ভ করে, তার সওম ভঙ্গ করা বৈধ হবে না। কারণ বাহানার ফলে আল্লাহর ফরয রহিত বা মওকুফ হয় না।
দুই. সত্যিকার অর্থে মুসাফির। এর তিন অবস্থা:
প্রথম অবস্থা: সওম যদি তার উপর খুব কষ্টকর হয়, তাহলে তার জন্য সওম হারাম। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতহে মক্কার সময় সওম অবস্থায় ছিলেন, তার নিকট সংবাদ পৌঁছল যে, মানুষের নিকট সিয়াম খুব কষ্টকর হচ্ছে, তারা আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় আছে। তিনি আসরের পর পানির পাত্র ডেকে আনলেন অতঃপর পান করলেন, সবাই তাকে দেখতে ছিল। তাকে বলা হল: কতক লোক সওম অবস্থায় আছে। তিনি বললেন: “তারা পাপী, তারা পাপী”[।মুসলিম: (১১১৪)]
দ্বিতীয় অবস্থা: সওম তার জন্য কষ্টকর, তবে বেশী কষ্টকর নয়। এমতাবস্থায় তার জন্য সওম মাকরূহ, কারণ এর দ্বারা নিজের উপর কষ্ট চাপিয়ে আল্লাহর শিথিলতা ত্যাগ করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

“আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না”। সূরা বাকারা: (১৮৫)
এখানে আল্লাহর ইচ্ছার অর্থ মহব্বত। যদি সওম রাখা না-রাখা উভয় সমান হয়, তাহলে সওম রাখাই উত্তম। কারণ এটা ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল।

সহিহ মুসলিমে আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

“আমরা কঠিন গরমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বের হয়ে, প্রখর রৌদ্রের কারণে এক সময় আমরা নিজেদের হাত মাথায় ধরে ছিলাম। আমাদের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ব্যতীত কেউ সওম অবস্থায় ছিল না”।[মুসলিম: (১১২২)]
নিজ শহর থেকে সফর আরম্ভকারী মুসাফির ফিরে আসা পর্যন্ত সফরে থাকে। সফরের দেশে যদিও তার অবস্থান দীর্ঘ ও লম্বা হয়, যদি তার নিয়ত থাকে যে, সফরের উদ্দেশ্য হাসিল হলেই দেশে ফিরবে। এমতাবস্থায় সে সফরের রোখসত গ্রহণ করবে, তার অবস্থান যত দীর্ঘ হোক। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর সমাপ্তির নির্দিষ্ট কোন সময় বর্ণনা করেননি। অতএব যতক্ষণ পর্যন্ত সফর ও সফরের বিধান শেষ হওয়ার দলিল কায়েম না হবে, সে সফর অবস্থায় থাকবে।
সাময়িক সফর ও ধারাবাহিক সফরে কোন পার্থক্য নেই। সাময়িক সফর যেমন হজ, ওমরা ও নিকট আত্মীয়দের দেখার জন্য সফর। ধারাবাহিক সফর যেমন ভাড়া গাড়ি ও অন্যান্য বড় গাড়ির চালক ও হেলপারগণের সফর। তারা যখন শহর ত্যাগ করবে, তখন থেকে তাদের জন্য মুসাফিরের বিধান আরম্ভ হবে, যেমন রমযানে পানাহার করা, চার রাকাত বিশিষ্ট সালাতকে দু’রাকাত আদায় করা এবং প্রয়োজন হলে যোহর-আসর ও মাগরিব-এশা একত্র আদায় করা। তাদের জন্য সওম না রেখে পানাহার করা উত্তম, কারণ তারা শীতের দিনে এসব সওম ক্বাযা করতে সক্ষম। তারা যখন নিজ দেশে অবস্থান করে, তখন তারা মুকিম, মুকিমদের সুবিধা-অসুবিধা তারা ভোগ করবে। আর যখন তারা সফরে থাকে, তখন তারা মুসাফির, মুসাফিরদের সুবিধা-অসুবিধা তারা ভোগ করবে।

আগামী পর্বে সওম ভঙ্গের কারণ প্রসঙ্গে আলোচনা হবে ইনশা আল্লাহ ।

সূত্র

মতামত দিন