ইসলামের ইতিহাস

বাংলাদেশে প্রথম ইসলাম প্রচার হয় কোন মসজিদ থেকে?

“দেশে ইসলাম প্রচার করেন ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন খিলজী” এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত থাকলেও এসব তথ্য প্রমান করে যে, এর অনেক আগেই এদেশে ইসলাম প্রচারিত হয়। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন খিলজীর বাংলা বিজয়ের প্রায় ৬০০ বছর আগেই সাহাবীদের দ্বারা বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব হয়। প্রথম মসজিদও নির্মিত হয় সেই সময়েই।

রংপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রাসুল (সা.)-এর মামা, মা আমেনার চাচাতো ভাই (রা.) ৬২০ থেকে ৬২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেন (পৃ. ১২৬)। ধারণা করা হয় চীনে যাওয়ার সময় নৌ রুটে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরে থেমেছেন এরং বাংলাকে ইসলামের সাথে পরিচয় করানোয় তার অবদান আছে। ধারণা করা হয়, ৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশের লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রামের মসজিদটি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, । অনেকে অনুমান করেন, পঞ্চগ্রামের মসজিদটিও তিনি নির্মাণ করেন যা ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কার করা হয়।

দেশের প্রথম ও প্রাচীন এই মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ২১ ফুট ও প্রস্থ ১০ ফুট। মসজিদের ভিতরে রয়েছে একটি কাতারের জন্য ৪ ফুট প্রস্থ জায়গা। মসজিদের চার কোণে রয়েছে অষ্টকোণ বিশিষ্ট স্তম্ভ। ধ্বংসাবশেষ থেকে মসজিদের চূড়া ও গম্বুজ পাওয়া গেছে।

‘জাতীয় অধ্যাপক’ দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফের মতে, হজরত ওমর রা. এর শাসনামলে মামুন, মুহাইমেন রা. নামক সাহাবিদ্বয় বাংলাদেশে আগমন করেন। বিশিষ্ট সাহাবি আবু ওয়াক্কাস রা. ৩য় হি. (৬২৬ খ্রি.) ইসলাম প্রচারের জন্য চীন যাওয়ার পথে কিছুকাল রংপুর এলাকায় অবস্থান করে ইসলাম প্রচার করেন, বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিষয়টির পক্ষে জোড়ালো প্রমাণ উপস্থান করা যায়। উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম রংপুরের ৪৮ কিমি দূরে লালমনিরহাট জেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের বড়বাড়িতে রামদাস মৌজার মসতার পাড় নামক স্থানে এক অভূতপূর্ব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা ৬৯ হিজরিতে (আনুমানিক ৬৯২ খ্রি.) নির্মিত একটি মসজিদ। এই মসতার পাড় স্থানটি বহুকাল ধরে ৭/৮টি উঁচু মাটির টিলা ও জঙ্গল দ্বারা আবৃত ছিল। যার স্থানীয় নাম ‘মজদের আড়া’। স্থানীয় ভাষায় ‘আড়া’ অর্থ জঙ্গলময় স্থান। এতোদিন কেউ হিংস্র জীবজন্তু, সাপ-বিচ্ছুর ভয়ে ভেতরে প্রবেশ করার সাহস পেত না। ১৯৮৭ সালে জমির মালিক তা আবাদযোগ্য করার চিন্তা করে জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে প্রাচীনকালের তৈরি ইট, যাতে আঁকা ছিল ফুল। আর মাটি ও ইট সরাতে সরাতে আশ্চর্যজনকভাবে পূর্ণ একটি মসজিদের ভিত খুঁজে পাওয়া গেল।

এর মধ্যে একটি শিলালিপি পাওয়া যায়, যার মধ্যে স্পষ্টাক্ষারে আরবিতে লেখা আছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ, হিজরি ৬৯ সাল। খননকাজে বিস্ময় বাড়তে থাকে। আরও খননের পর মসজিদের মেহরাব এবং মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠ ও ইমাম সাহেব যে স্থানে খুৎবা পাঠ করতেন, তাও আবিষ্কৃত হয়। তখন থেকেই এলাকার লোকজন এ স্থানে টিন দিয়ে একটি সাধারণ ছোটোখাট মসজিদ তৈরি করে নামাজ পড়ে থাকেন। তারা মসজিদটির নাম দিয়েছেন ‘হারানো মসজিদ’। তাই এটা বলা যেতে পারে, আরব থেকে আগত মুসলমান যারা ৬৯ হিজরিতে এ এলাকায় বসবাস করেছিলেন এবং নিজেদের ধর্মীয় প্রয়োজনে মসজিদও তৈরি করে ছিলেন। সেই থেকেই বাংলাদেশে ইসলামের প্রচারের কাজ আরম্ভ হয়।

তাহলে আমরা বলতে পারি যে দেশের সর্বপ্রথম মসজিদ হলো আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) মসজিদ যা লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রামে অবস্থিত এবং এটি নির্মাণ করেন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)। রাসুল (সাঃ) যে দশজন সাহাবীকে জান্নাতি বলে ঘোষণা করেছিলেন তার মধ্যে একজন ছিলেন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)।

মতামত দিন